কলমেঃএম.মোরশেদ আলম
লেখক,শিক্ষক ও বাচিক শিল্পী
পড়ন্ত বিকেল!সূয্যিমামা আলো আধারির গল্প লিখাতে ব্যস্ত সময় পার করছে।পাশ দিয়ে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদীর কলকল শব্দের ছন্দে মন কিছুটা বেখেয়ালি ভাব ছেড়ে বাস্তবে ফেরার মন স্থির করেছে সবেমাত্র।এই যে নদীর তীরে বসে থাকার জায়গাটুকুর সাথে ফেলে আসা সময়ের অনেকখানি স্মৃতিরোমন্থন এর হিসাব কষা আছে।যার মাঝে যতটা না সুখের তার চেয়ে খানিকটা বেশি হবে দুঃখের।তবে এই দুঃখ কথনের গল্পের শুরু কিংবা শেষের সাথে পাওয়া কিংবা না পাওয়ার হিসেবটা খুব বেশি জড়িত নয়।তাহলে তো প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক যে, এই আবার এমন কি কষ্ট যেখানে পাওয়া বা না পাওয়ার হিসেবটা মূখ্য নয় বরং অনেকটাই গৌণ।উত্তরটা স্বাভাবিকতার বাইরে গিয়ে একটু কাব্যিকতার আশ্রয়েই না হয় অবতারণা করা যাক। চলমান গল্প থেকে একটু বাইরে চোখ মেলে দেখা যাক।ফিরে আসি পড়ন্ত বিকেলের নদীর কলতানের শব্দের সাথে আনমনে বসে থাকার মিতালির কাছে।এই ফিরে আসার ছোট্ট একটি কারণ আছে, আর তাহলো আমার কাছ থেকে কিছুটা দূরে বসে আলাপরত এলাকার পরিচিত দুই যুবকের কথামালা।কানে ভেসে আসা কথাতে কিছুটা আচ করতে পারছিলাম তারা খুবই উদ্বীগ্ন আত্নহত্যা বিষয়ক সাম্প্রতিক আমার এলাকায় ঘটা মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুটি ঘটনায়।
তাদের কথার রেশ থাকতেই আমি নিজ মনে ভাবনায় পড়লাম যে,আচ্ছা এই আমরাই তো এই এক জীবনে সুখী হওয়ার জন্য কতই না কিছুর প্রতিযোগিতা করি,যেটা সুস্থ বা অসুস্থ প্রতিযোগিতা কিনা তাও ভাবনার ফুসরত বা ইচ্ছা কোনটায় নেই আমি বা আমরা নামক মানব যন্ত্রটার। তাহলে যারা নিজ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পড়ে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আত্নহননের পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের কাছে ঠিক সেই সময়ে এই রঙিন জীবনের মানেটা কি দাড়াই? জানি আমার এই আপনমনে ভাবনার প্রশ্নের উত্তরটা এক শব্দে প্রদান সম্ভবপর হলেও ভিতরের ভাবাবেগটি অনেক গভীর হবে।গল্পের মাঝে নতুন মোড় নেওয়ার আগ পর্যন্ত পাওয়া আর না পাওয়ায় যে কষ্টের কথা উঠে এসেছিল অনেকটা আলো আধারির ভেলাতে, তার যবনিকা বোধহয় এতক্ষণে হয়ে গেছে পড়ন্ত বিকেলের হিমেল হাওয়াতে নদীর পাড়ের যুবকদের আলাপের উদ্বেগের মাঝে।আচ্ছা কেউ কি আসলেই নিজ ইচ্ছাতে আত্নহত্যার পথে পা বাড়ায়? উত্তর যদি না এর পানে পা বাড়ায় তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক আমাদের আশেপাশে সুইসাইড পদক্ষেপের দৃশ্যমান বিশেষ কারণগুলো কি কি হতে পারেঃ
১. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাঃ
বিষণ্ণতা ও হতাশা : ব্যক্তি জীবনে তীব্র বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং অ্যানজাইটি আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে মুড সুইং বা মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মারাত্মক রূপ নেয়।
এছাড়া অন্যান্য মানসিক ব্যাধি যেমন, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো সমস্যার কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক ও ক্যারিয়ারের চাপঃ
পরীক্ষার ফলাফল ও পড়াশোনার চাপ:
জিপিএ-৫ পাওয়া বা তীব্র প্রতিযোগিতা, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় তরুণদের ওপর অসহনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা: ক্যারিয়ার গঠন বা বেকারত্বের ভয় এক ধরণের তীব্র হতাশা তৈরি করে।যা আত্নহননের দিকে প্রবাহিত করে দেয়।
৩. পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ
পারিবারিক কলহ ও দূরত্ব: বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি, ডিভোর্স, বা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগের অভাব মানুষকে একাকী করে তোলে। পরিবারের পক্ষ থেকে মানসিক সমর্থন না পাওয়া একটি বড় কারণ।
বুলিং এবং সাইবার বুলিং: স্কুল-কলেজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য বন্ধুদের দ্বারা উপহাস, কটূক্তি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক তরুণ চরম পথ বেছে নেয়।
সম্পর্কের টানাপোড়েন: প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে ভাঙন বা কাছের কোনো মানুষের সাথে তীব্র অবহেলা ও প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পারা।কিংবা মিথ্যা অপবাদ প্রদান।
৪. সাইকোলজিক্যাল ট্রমা
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন: শৈশবে বা কৈশোরে কোনো ধরণের শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা তরুণ বয়সে আত্মহত্যার চিন্তাকে উস্কে দিতে পারে।
হঠাৎ কোনো বড় ক্ষতি: প্রিয় কোনো মানুষের মৃত্যু বা কোনো বড় বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে না পারা।
৫. সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব
ভার্চুয়াল জীবন ও তুলনা: সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের নিখুঁত জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করে হীনম্মন্যতায় ভোগা।
অনলাইন আসক্তি: অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, রাত জাগা এবং ক্ষতিকারক অনলাইন গেম বা চ্যালেঞ্জের প্রভাব।
পরকীয়ায় আসক্তিঃ এই আসক্তি বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌছেছে। যার কারণে যে কোন সময় যেকোন অগঠনের জন্ম দিতে পারে এক নিমিষেই।
৬. মাদকাসক্তিঃ
মাদক বা অ্যালকোহলের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং তাৎক্ষণিক আবেগের বশে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।
এছাড়াও আরো কিছু কারণে মানুষ আত্নহননের পথ বেছে নিতে পারেঃ
তাৎক্ষণিক আবেগের বশবর্তী হওয়া
পরিচয় সংকট ও হীনম্মন্যতা
আর্থিক সংকট
মিডিয়া ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব
একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা
আত্নহননের পথ থেকে উত্তোরণের উপায়ঃ
আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। আমার মতে আত্মহত্যার প্রবণতা বা চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং অন্যদের রক্ষা করার উপায়গুলোকে মূলত দুটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারেঃ
১. ব্যক্তিগত সচেতনতা
কথা বলা ও শেয়ার করা: মনের ভেতর কষ্ট বা আত্মঘাতী চিন্তা জমিয়ে না রেখে বিশ্বাসভাজন কোনো বন্ধু, শিক্ষক বা পরিবারের সদস্যকে পরিষ্কার করে বলে ফেলা । প্রকাশ করলে মানসিক চাপ অর্ধেক কমে যায়।
পেশাদার সাহায্য নেওয়া: মানসিক রোগ কোনো ট্যাবু বা লজ্জার বিষয় নয়। তীব্র হতাশা বোধ করলে অবিলম্বে একজন সাইকোলজিস্ট (কাউন্সিলর) বা সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া।
তাৎক্ষণিক চিন্তা থেকে মনোযোগ সরানো: যখনই আত্মহত্যার তীব্র চিন্তা মাথায় আসবে, নিজেকে একা না রাখা । সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে মানুষের মাঝে যাওয়া, চোখে-মুখে ঠাণ্ডা জল দেওয়া বা পছন্দের কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা।
সোশ্যাল মিডিয়া ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে থাকা: যা কিছু মনের কষ্ট বাড়ায় (যেমন: সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের জীবনের সাথে তুলনা, বিষণ্ণতার গান বা ভিডিও) সেগুলো থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা।
২. পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধঃ
লক্ষণগুলো চেনা ও গুরুত্ব দেওয়া: কেউ যদি হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেয়, সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে, নিজের প্রিয় জিনিস অন্যকে দিয়ে দেয়, বা কথায় কথায় “আমি মরে গেলে ভালো হতো” এই জাতীয় কথা বলে তবে তা কখনোই ‘নাটক’ বা ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে তার প্রতি যত্ন বাড়ানো।
বিনা বিচারে কথা শোনাঃ
হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিকে কোনো উপদেশ বা খোটা না দিয়ে, তার কষ্টের কথাগুলো মন দিয়ে শুনা। তাকে বোঝানো যে সে একা নয়, আমি, আপনি বা আপনারা তার পাশে আছেন।
সহায়তার পরিবেশ তৈরি করা: পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের জন্য সন্তানদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা প্রত্যাশা চাপিয়ে না দেওয়া। ঘরের পরিবেশকে এমন রাখা যেন সন্তান যেকোনো ভুলের কথা দ্বিধাহীনভাবে বাবা-মাকে বা বড়দের বলতে পারে।
ধর্মীয় বিধিবিধান ও নৈতিক শিক্ষা জোরদারঃ
ধর্মীয় শাসন বারণ ও প্রার্থনাতে আগ্রহী হিসেবে ছোটবেলা থেকে সন্তানকে গড়ে তুলা।আর নীতি নৈতিকতার বিষয়াদি মেনে চলার প্রবণতা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।
ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান দূরে রাখা: ঘরে থাকা বিষাক্ত ওষুধ, কীটনাশক বা ধারালো বস্তু বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির নাগালের বাইরে রাখা।
ব্যক্তি জীবনের সমস্যা, সুনির্দিষ্ট পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা সাপেক্ষে আত্নহত্যা করা বা আত্নহননের থেকে উত্তোরণের পথ বা উপায় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়,
যখন একজন ব্যক্তির ভেতরের মানসিক কষ্ট তার সহ্য করার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায় এবং সে মনে করে এই পরিস্থিতি আর কখনোই বদলাবে না, তখনই সে আত্মহত্যার পথ খোঁজে।
পরিবারের একটু সহানুভূতি এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা অনেক জীবন বাঁচাতে পারে।
আত্মহত্যার চিন্তা একটি সাময়িক মানসিক ঝড়। সঠিক চিকিৎসা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।