বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস-সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও জোরদার গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিকেল তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। সরকারি দলের সদস্য সুলতানা আহমেদের তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের এসব মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশীয় উৎস থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে ১৫০টি কূপ খননের পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার সুস্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্র, আসছে নতুন পিএসসি
সমুদ্রাঞ্চলে বিপুল তেল-গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে নেওয়া পদক্ষেপের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র (ইন্টারন্যাশনাল বিডিং রাউন্ড) আহ্বান করা হয়েছে গত ২৪ মে। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত যোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের স্থলভাগে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণে সময়োপযোগী নীতি প্রণয়নের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি–২০২৬’ চূড়ান্ত করার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও সরবরাহ সক্ষমতা
আমদানিনির্ভর এলএনজি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে বর্ধিত চাহিদা ও আকস্মিক সংকট সামাল দিতে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি বৃহৎ স্থলভিত্তিক (ল্যান্ড-বেসড) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি (আরএলএনজি) জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প বিকাশের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
ভোলায় হবে সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র
ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডের পাইপলাইনে যুক্ত করার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় নেটওয়ার্কে আনতে হলে অন্তত সাত বছর সময় প্রয়োজন। ফলে এই দীর্ঘ সময়ে সম্পদটি ফেলে না রেখে স্থানীয়ভাবেই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সদ্ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ভোলায় প্রাপ্ত গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে একটি আধুনিক সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সেখানে গ্যাসভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে।
এর বাইরে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে পাইপলাইনহীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে বলে সংসদকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার
শিল্প খাতের টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড), রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বক্তব্যের সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, শিল্প ও রপ্তানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নিরাপদ ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।








