আব্বাস হোসাইন আফতাব : এক দশক আগে জাতীয়করণের জন্য সরকারি দপ্তরে তথ্য পাঠানো হয়েছিল। এরপর চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিস থেকে জাতীয়করণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশসহ তথ্য পাঠানো হয়। পরের বছরও জাতীয়করণের জন্য প্রস্তাবিত তালিকায় রাখা হয়েছিল বিদ্যালয়টির নাম। কিন্তু এত বছর পরও জাতীয়করণ হয়নি রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে রাঙ্গুনিয়ায় শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসা এই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের দাবি এখন নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, পুরোনো সরকারি নথি পর্যালোচনা করে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জাতীয়করণের দাবির পেছনে রয়েছে সরকারি নথিপত্র।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৭ আগস্ট ২০১৫ তারিখের এক চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের লক্ষ্যে উপজেলা সদরের মানসম্পন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের তথ্য চাওয়া হয়।
ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের তথ্য জাতীয়করণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা অফিস থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়।
সেখানে বলা হয়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের তথ্য জাতীয়করণের লক্ষ্যে নির্ধারিত ছকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ের তথ্য ১৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে অনলাইনেও পাঠানো হয়েছিল।
চিঠিতে বিদ্যালয়টিকে উপজেলা সদরের মানসম্পন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয়করণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশসহ তথ্য পাঠানোর কথা বলা হয়।
অর্থাৎ, জাতীয়করণের বিষয়টি তখন শুধু স্থানীয় পর্যায়ের দাবি ছিল না সরকারি পর্যায়েও বিদ্যালয়টির তথ্য পাঠানো ও সুপারিশের প্রক্রিয়া হয়েছিল।
২০১৬ সালেও জাতীয়করণের তালিকায়
পরের বছরও বিদ্যালয়টির নাম উঠে আসে সরকারি নথিতে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখের নথিতে জাতীয়করণের জন্য পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানো হয়। তালিকায় প্রথম ছিল রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। অর্থাৎ, ২০১৫ সালে তথ্য প্রেরণ ও জেলা শিক্ষা অফিসের সুপারিশের পর ২০১৬ সালেও বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য প্রস্তাবিত তালিকায় ছিল।
কিন্তু এরপর আর এগোয়নি সেই প্রক্রিয়া অন্তত স্থানীয় পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
প্রশ্ন উঠছে, কোথায় আটকে গেল?
পুরোনো সরকারি নথি সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয়করণের জন্য তথ্য চাওয়া হলো, তথ্য পাঠানো হলো, জেলা শিক্ষা অফিস সুপারিশ করল, পরের বছর বিদ্যালয়টির নাম জাতীয়করণের তালিকাতেও থাকল; তাহলে এরপর কী হলো?
কোন পর্যায়ে গিয়ে থেমে গেল উদ্যোগটি?
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পুরোনো নথি পর্যালোচনা করে জাতীয়করণের সেই প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থান খুঁজে বের করুক। প্রয়োজনে নতুন করে বিদ্যালয়টির তথ্য যাচাই করে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
‘বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন’। প্রধান শিক্ষক এম মিজানুর রহমান বলেন, ” ২০১৫ সালে স্কুলটিকে জাতীয়করণের দাবীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ প্রায় হাজার খানেক মানুষের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি তথকালীন ইউএনও সাহেবকে জমা দিই। পরবর্তীতে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে অন্ততঃ তিনবার এই প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণের বিষয়ে সুপারিশ প্রেরিত হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের জাতীয়করণনের তালিকায় রাঙ্গুনিয়া পাইলট স্কুলের নাম না থাকায় আমরা হতাশ হই। এর পর অর্থাৎ ২০১৮ সাল থেকে বহুবার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক বার যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। রাঙ্গুনিয়ার সর্বপ্রথম এবং শতবর্ষী বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণের আওতায় আনার জন্য এমপি মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কাননা করছি।”
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় একটি শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাঙ্গুনিয়ার শিক্ষা বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জাতীয়করণের বিষয়ে অতীতে সরকারি পর্যায়ে তথ্য প্রেরণ ও সুপারিশের নথি রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।’
মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘বিদ্যালয়টির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষার মান ও দীর্ঘদিনের অবদান বিবেচনায় জাতীয়করণের দাবি যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। পুরোনো নথিপত্র পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি যথাযথভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয়করণ একটি নীতিগত ও সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম নিতে হবে। বিদ্যালয়ের স্বার্থে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।’
জাতীয়করণের দাবির সঙ্গে বিদ্যালয়টির দীর্ঘ ইতিহাসও বারবার সামনে আসছে।
স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১২ সালে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার পাশে সৈয়দবাড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কার্যালয়ের কাছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। ১৯১৫ সালে বাঁশের খুঁটি ও ছাউনির ঘরে শুরু হয় মাধ্যমিক শিক্ষার কার্যক্রম।
১৯২৫ সালে বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবনের নিচতলায় প্রথম পাকা ঘর নির্মিত হয়। ১৯৩৫ সালে নির্মিত হয় টিনের ছাউনির পাকা ঘর।
বাঁশের ঘর থেকে শুরু করে শতবর্ষের পথ পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাঙ্গুনিয়ার বহু পরিবারের সঙ্গে এই বিদ্যালয়ের সম্পর্ক কয়েক প্রজন্মের। কারও বাবা এখানে পড়েছেন, পরে সন্তানও পড়েছে। অনেকের কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিদ্যালয়ের মাঠ, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের সঙ্গে।
এই বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে অনেকে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ফলে স্থানীয়দের কাছে বিদ্যালয়টির গুরুত্ব শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, এটি রাঙ্গুনিয়ার শিক্ষা-ঐতিহ্যেরও অংশ।
আর সেই কারণেই জাতীয়করণের দাবি শুধু বর্তমান শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের দাবি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাবেক শিক্ষার্থীদেরও প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের বক্তব্য, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের সরকারি নথি জাতীয়করণের দাবিকে একটি নথিভিত্তিক ভিত্তি দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
তাই তাঁদের দাবি, পুরোনো উদ্যোগের অগ্রগতি খুঁজে দেখা হোক। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের বর্তমান যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হোক। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কার্যকর প্রস্তাব পাঠানো হোক।
এক দশক আগে সরকারি দপ্তরে জাতীয়করণের জন্য যে তথ্য গিয়েছিল, তার পরের অধ্যায় এখনো অনেকের কাছে অজানা। ২০১৬ সালের তালিকায় নাম থাকার পরও কেন জাতীয়করণ হলো না, সেই প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি।
শতবর্ষ পেরিয়ে রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক প্রত্যাশার সামনে।
স্থানীয়দের চাওয়া, পুরোনো নথি যেন শুধু অতীতের দলিল হয়ে না থাকে। এক দশক আগে শুরু হওয়া উদ্যোগটি নতুন করে পর্যালোচনা করা হোক। বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস, শিক্ষা বিস্তারে অবদান এবং বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয়করণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
বাঁশের ঘর থেকে শতবর্ষের পথ পেরিয়ে আসা বিদ্যালয়টির এখন প্রত্যাশা,অতীতের সেই সরকারি সুপারিশ এবার নতুন করে গতি পাক, আর দীর্ঘদিনের জাতীয়করণের দাবি বাস্তবতার মুখ দেখুক।