আব্বাস হোসাইন আফতাব:
রাতের সড়ক। পড়ে আছেন এক নারী। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন, রক্তে ভেজা শরীর। সাহায্যের জন্য হয়তো তাকিয়ে ছিলেন আশপাশের মানুষের দিকে। কিন্তু তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের হাতে তখন মুঠোফোন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন।
এভাবেই বুধবার(২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কাপ্তাই সড়কের চন্দ্রঘোনা চারাবটতলা এলাকায় দীর্ঘ সময় পড়ে ছিলেন দুর্ঘটনায় আহত এক নারী। দ্রুতগতির একটি অজ্ঞাত গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুঠোফোনের ক্যামেরার বদলে এগিয়ে আসে কিছু মানুষের হাত। মরিয়মনগর চৌমুহনী এলাকায় একটি সভা শেষে ফেরার পথে বিএনপি নেতা ইউসুফ সিকদার, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব এস এম লোকমান, যুবদল নেতা মাসুদ পারভেজ ও ছাত্রদল নেতা শওকতসহ কয়েকজন তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে তাঁকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
আহত নারীর পরিচয় তখনও জানা যাচ্ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে শনাক্ত করেন।
তিনি সরফভাটা ইউনিয়নের নাথপাড়া গ্রামের সুভাষ নাথের স্ত্রী বীনা নাথ (৫০)। স্বজনরা বলছেন, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং বুধবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
বীনা নাথের সন্তান নয়ন নাথ জানান, বুধবার বেলা তিনটার দিকে ধোপপুল এলাকার ভাড়া বাসা থেকে তাঁর মা নিখোঁজ হন। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকেন। রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত এক নারীর ছবি দেখে তাঁরা তাঁকে শনাক্ত করেন।
খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনা হঠাৎ ঘটে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর আহত মানুষটির পাশে দাঁড়ানো না দাঁড়ানো মানুষের হাতে থাকে। সেই রাতের ঘটনাটি তাই শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার গল্প নয়, এটি মানুষের দায়িত্ববোধেরও একটি প্রশ্ন।
রক্তাক্ত অবস্থায় একজন মানুষ সড়কে পড়ে আছেন, অথচ কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। আবার কয়েকজন মানুষ নিজেদের গন্তব্যের পথে না গিয়ে থেমেছেন, তাঁকে তুলে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন।
উদ্ধারকারী নেতৃবৃন্দ বলেন, সড়কে দুর্ঘটনায় আহত বা অসহায় কোনো মানুষকে পড়ে থাকতে দেখলে ছবি বা ভিডিও ধারণে ব্যস্ত না হয়ে দ্রুত তাঁকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।
বীনা নাথের পরিচয় মিলেছে, পরিবার তাঁকে ফিরে পেয়েছে। কিন্তু চন্দ্রঘোনার সেই রাত একটি প্রশ্ন রেখে গেছে, সড়কে আহত হয়ে পড়ে থাকা একজন মানুষের জন্য আমরা প্রথমে মুঠোফোনটি বের করব, নাকি হাত বাড়িয়ে দেব?