পূর্ণিমা তিথিতে ঘরে ঘরে পূজা-অর্চনা, সন্ধ্যা থেকে রাতভর চলবে ধর্মীয় আচার
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আজ রোববার (২৫ অক্টোবর)। শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমা তিথিতে ধন-সম্পদ, সুখ-শান্তি, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করছেন ভক্তরা। এ উপলক্ষে বিভিন্ন বাড়িতে পূজা-অর্চনা, প্রদীপ প্রজ্বালন, লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য, প্রাচুর্য ও কল্যাণের প্রতীক। সংসারে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা, অভাব-অনটন দূর করা এবং পরিবারের সার্বিক মঙ্গল কামনায় ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। বাংলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপূজা দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। ‘কোজাগরী’ শব্দটি সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছ?’ প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী ভক্তদের গৃহে আগমন করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ করেন। এ বিশ্বাস থেকেই অনেক ভক্ত রাতে জেগে থেকে দেবীর পূজা-অর্চনা ও প্রার্থনায় অংশ নেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের পর এই পূর্ণিমা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দুর্গাপূজার উৎসবমুখর পরিবেশের পর লক্ষ্মীপূজা ঘিরে গৃহস্থ পরিবারগুলোতে নতুন করে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, পূজার স্থান সাজানো, আলপনা আঁকা এবং প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীকে বরণ করে নেন।
ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, লক্ষ্মীপূজায় দেবীর প্রতিমা বা ছবি স্থাপন করে ফুল, ফল, মিষ্টি, নৈবেদ্য ও অন্যান্য উপাচার নিবেদন করা হয়। অনেক পরিবারে ধান, চাল, শস্য ও অন্যান্য কৃষিজ উপকরণও পূজার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পূজা শেষে ভক্তরা প্রসাদ গ্রহণ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন।
দেবী লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা। সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে তিনি সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে লক্ষ্মীপূজার তাৎপর্য শুধু অর্থ-সম্পদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পারিবারিক শান্তি, শৃঙ্খলা, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনাও এ পূজার অন্যতম অনুষঙ্গ।
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে লক্ষ্মীপূজার অন্যতম আকর্ষণ ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’ পাঠ। দেবী লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য, ধর্মীয় কাহিনি ও নীতিশিক্ষামূলক উপাখ্যান নিয়ে রচিত পাঁচালি পূজার সময় পাঠ করা হয়। অনেক পরিবারে বংশপরম্পরায় এই রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
গ্রামবাংলার গৃহস্থ পরিবারগুলোতে লক্ষ্মীপূজা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময় এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার সুযোগও তৈরি হয়।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পালিত হচ্ছে ২৫ অক্টোবর, রোববার। পূর্ণিমা তিথি আজ বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয়েছে এবং আগামীকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে শেষ হবে।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে ভক্তদের প্রার্থনা, দেবীর আশীর্বাদে সবার জীবনে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হোক। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় হোক—এমন প্রত্যাশা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের।