আব্বাস হোসাইন আফতাব :
একটি শ্রেণিকক্ষ, সারি সারি বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা পাঠ আর বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডা। প্রতিদিনের পরিচিত এই পরিবেশের সঙ্গে কখন যে মিশে গেছে জীবনের কত গল্প, কত স্মৃতি, তা হয়তো এত দিন ভাবার অবকাশ হয়নি। কিন্তু শেষ ক্লাসের দিনে এসে সেই পরিচিত শ্রেণিকক্ষই যেন হয়ে উঠল আবেগের এক অন্য নাম। কোথাও হাসি, কোথাও নীরবতা, কোথাও আবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে নতুন করে পথচলার প্রস্তুতি। মজুমদারখীল উচ্চবিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এসএসসি–২০২৭ ব্যাচের শেষ ক্লাস উপলক্ষে আয়োজিত স্মৃতিচারণ ও শুভকামনা অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল এমনই আবেগঘন পরিবেশ। বালক ও বালিকা শিক্ষার্থীদের পৃথক আয়োজনে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দ, ভালোবাসা, স্মৃতিচারণ আর আগামীর প্রত্যয়ে ভরা এক বিশেষ দিন।
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিনের উপস্থিতি, শিক্ষকদের পাঠদান, সহপাঠীদের সঙ্গে দুষ্টুমি, পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি আর অবসরে গল্পগুজব, সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে শিক্ষাজীবনের এক অনন্য অধ্যায়। এই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের সামনে ভেসে ওঠে ফেলে আসা দিনগুলোর নানা স্মৃতি। যে বিদ্যালয় একদিন ছিল তাদের প্রতিদিনের গন্তব্য, সেই বিদ্যালয় থেকেই এবার শুরু হবে নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি।
তবে শেষ ক্লাস মানেই সবকিছুর শেষ নয়। বরং এটি জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশের সিঁড়ি। সামনে এসএসসি পরীক্ষা, ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জ। তাই বিদায়ের আবেগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল আগামী দিনের স্বপ্ন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ খাঁন, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং অভিভাবক প্রতিনিধি আবু বকর। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক আনন্দ কুমার বড়ুয়া, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অসিত বরণ চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা জ্যোৎস্না আক্তার ও রুমা পারভেজ, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক জহির আহমেদ, জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা নাছিমা বেগম এবং সহকারী শিক্ষক উৎপল চন্দ্র শর্মা ও মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ শিক্ষার্থীদের সামনে জীবনে সফল হওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, পরিশ্রম মানুষকে লক্ষ্যের কাছে নিয়ে যায়, শৃঙ্খলা সঠিক পথে রাখে, সততা সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে আর আত্মবিশ্বাস অসম্ভবকেও সম্ভব করার সাহস জোগায়। তাঁর এই উপদেশ যেন শিক্ষার্থীদের সামনে ভবিষ্যৎ গড়ার একটি পথনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ওমর ফারুক শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন, নিয়মিত বিদ্যালয়জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও স্বপ্নের যাত্রা এখানেই শেষ নয়। সামনে অপেক্ষা করছে পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নিজেকে প্রমাণ করার নানা সুযোগ। প্রস্তুতি, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবক প্রতিনিধি আবু বকর শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পেছনে না ছুটে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, জ্ঞান, সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়েই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়। সময়ের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষকদের বক্তব্যেও উঠে আসে শিক্ষার্থীদের প্রতি দীর্ঘদিনের স্নেহ, প্রত্যাশা ও ভালোবাসার কথা। তাঁরা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যতে তারাই এই বিদ্যালয়ের পরিচয় ও গৌরব বহন করবে। তাদের সাফল্যই হবে শিক্ষকদের শ্রম, ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনের অন্যতম প্রাপ্তি।
বিদ্যালয়জীবনের অনেক কিছুই হয়তো সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে। বদলে যাবে শ্রেণিকক্ষ, বদলাবে দৈনন্দিন রুটিন, সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগও কমে আসবে। কেউ এগিয়ে যাবে উচ্চশিক্ষার পথে, কেউ বেছে নেবে জীবনের অন্য কোনো লক্ষ্য। কিন্তু এই বিদ্যালয়ে কাটানো দিনগুলো, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ-বেদনা আর শিক্ষকদের স্নেহের স্মৃতি মনের গভীরে থেকে যাবে।
জীবনের পথে চলতে গিয়ে একসময় হয়তো এই শিক্ষার্থীরা ফিরে তাকাবে আজকের দিনটির দিকে। মনে পড়বে শেষ ক্লাসের সেই মুহূর্ত, প্রিয় সহপাঠীদের মুখ, শিক্ষকদের উপদেশ আর একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য দিনের কথা। তখন উপলব্ধি করবে, বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়, এটি মানুষ হয়ে ওঠারও এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা।
এসএসসি–২০২৭ ব্যাচের সামনে এখন নতুন এক লড়াই। সেই লড়াই পরীক্ষার, স্বপ্ন পূরণের, নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের। শেষ ক্লাসের স্মৃতিকে শক্তি করে, শিক্ষকদের উপদেশকে পথচলার সঙ্গী করে তারা এগিয়ে যাক সাফল্যের দিকে। তাদের ফলাফল হোক আশাব্যঞ্জক, ভবিষ্যৎ হোক আলোকিত, আর অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হোক সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ।
একটি শেষ ক্লাস, অসংখ্য স্মৃতি, অগণিত স্বপ্ন। বিদ্যালয়ের ঘণ্টা হয়তো থেমে যাবে এই অধ্যায়ের জন্য, কিন্তু থামবে না জীবনের পথচলা।