ইসমাইল হুসাইন
৭–৮ বছরের একটি শিশু। রাঙ্গুনিয়ার গোচরা এলাকার একটি স্থানীয় হেফজখানার ছাত্র। গতকাল শিশুটি চেম্বারে এসেছিল মুখের পাশে বেতের আঘাতে কাটা ক্ষত আর কানে তীব্র ব্যথা নিয়ে। তার কানের পর্দা ছিঁড়ে গেছে আঘাতে। শিশুটির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার শিক্ষক তাকে বেধড়ক মারধর করেছেন।
ঘটনাটি জানার পর মনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, শিক্ষা দেওয়ার নামে একটি শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ কেন?
হেফজখানার শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে আমানত। অভিভাবকেরা বিশ্বাস করে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষকের হাতে তুলে দেন। তাঁরা আশা করেন, সন্তান ধর্মীয় শিক্ষা পাবে, নৈতিকতা শিখবে, ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে। সেই বিশ্বাসের জায়গায় যদি শিশুকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
শৃঙ্খলা শেখানোর প্রয়োজন আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মকানুন থাকবে, ভুল করলে শিশুকে বোঝানো হবে, প্রয়োজনে তার আচরণ সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু শাসনের নামে বেত্রাঘাত, রক্তাক্ত করা কিংবা এমন আঘাত করা, যাতে কানের পর্দা ছিঁড়ে যায়, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মাদ্রাসা হোক কিংবা সাধারণ বিদ্যালয়, শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি কখনো শারীরিক নির্যাতন হতে পারে না। ভয় দেখিয়ে শিশুকে সাময়িকভাবে চুপ করানো যায়, কিন্তু তার মনে যে ভয়, অনিরাপত্তা ও মানসিক ক্ষত তৈরি হয়, তা সহজে দূর হয় না। যে শিক্ষককে দেখে শিশুর নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি তৈরি হওয়ার কথা, সেই শিক্ষকের হাতেই নির্যাতিত হলে শিশুর মনে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে।
একটি শিশুর বয়স মাত্র সাত কিংবা আট বছর। এই বয়সে তার প্রয়োজন ভালোবাসা, যত্ন, নিরাপত্তা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে বলা যায়। ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা অন্য যেকোনো শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই ধৈর্য ও মানবিকতা জরুরি। শিশুর কোমল মনকে আঘাত করে কখনো প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া যায় না।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সন্তানকে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন, সেখানে তার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, সে নিরাপদ বোধ করছে কি না, কোনো ভয় বা অস্বস্তির কথা বলছে কি না এসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিকে শিক্ষকদের আচরণ তদারক করতে হবে এবং অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিশুটির কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি শিশুর শারীরিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, শিশুটির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে অন্য কোনো শিশুকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে।
আমরা চাই, শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করুক, নৈতিকতা শিখুক, ভালো মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক। কিন্তু সেই শিক্ষার পরিবেশ হতে হবে নিরাপদ, মানবিক ও ভালোবাসাপূর্ণ। শিক্ষক হবেন শিশুর পথপ্রদর্শক, আতঙ্কের কারণ নন।
শাসন আর নির্যাতন এক বিষয় নয়। শৃঙ্খলার নামে শিশুর শরীরে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। শিশুরা আমাদের আমানত, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সবার দায়িত্ব।
লেখক- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক