আব্বাস হোসাইন আফতাব :
সাংবাদিকতা এমন এক পেশা, যেখানে কখনো রাজপ্রাসাদের দরজায় কড়া নাড়তে হয়, কখনো যেতে হয় নিভৃত কুঁড়েঘরে। কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, কখনো দাঁড়াতে হয় সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের পাশে। রাজা থেকে ফকির সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে হয়, কারণ খবরের কোনো শ্রেণিবিভাগ নেই, মানুষের কথারও কোনো পদমর্যাদা নেই।
অথচ আমাদের দেশে সাংবাদিকতার পরিচয় দিতে গেলেও মাঝেমধ্যে পরিচিতির পরীক্ষা দিতে হয় ! কে কাকে চেনে, কার সঙ্গে কার ওঠাবসা, কার ফোনে কার নম্বর এসবের অদৃশ্য খতিয়ান যেন কারও কারও কাছে সাংবাদিকতার যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি।
একাধিকবার শুনেছি, ‘অমুককে তুমি চেনো না?’
বিনয়ের সঙ্গে বলি, না ভাই, চিনি না।
আমি বিসিএস পরীক্ষার্থী নই যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম বা পরিচয়ের তালিকা মুখস্থ করে পরীক্ষার হলে বসব। আমি সংবাদকর্মী। পেশাগত প্রয়োজনে যাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব। খবরের স্বার্থে প্রয়োজন হলে পরিচিত হব, কথা বলব, লিয়াজোঁ রাখব। কিন্তু পৃথিবীর সব ক্ষমতাবান মানুষকে চিনে রাখার কোনো চুক্তিতে তো স্বাক্ষর করিনি !
আর আমাকেও সবাই চিনবে, এমন প্রত্যাশা কেন থাকবে ? আমার কাজ যদি সংবাদ তুলে ধরা হয়, তবে আমার পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হোক কাজের মধ্য দিয়ে, কারও পরিচিতির তালিকায় নাম লিখিয়ে নয়।
বিস্ময় লাগে, মানুষ কখনো কখনো নিজের পরিচয়কে বড় করে দেখাতে গিয়ে অন্যের পরিচয়কেই ছোট করতে চায়। কে কাকে চেনে, কে কার সঙ্গে ছবি তুলেছে, কার সঙ্গে চা খেয়েছে এসবের হিসাব মেলাতে মেলাতে মূল কাজটাই যেন আড়ালে পড়ে যায়। পরিচিতির বৃত্ত বড় হয়, অথচ দৃষ্টিভঙ্গির পরিধি কতটা বড় হয়, সেই প্রশ্নটি অনুচ্চারিত থেকে যায়।
মানুষের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বড় বিচিত্র জিনিস! কেউ পরিচয় তৈরি করে কাজ দিয়ে, কেউ পরিচিতি দিয়ে, আবার কেউ পরিচিত মানুষের নাম ভাঙিয়ে নিজের গুরুত্ব বোঝাতে চায়। আমি শুধু দেখি, কখনো মুচকি হাসি, কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
এমন সময়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখাই যেখানে কঠিন, সেখানে ইউটিউবার, সাংবাদিক কিংবা ইউটিউবার থেকে হ্যাডম বনে যাওয়া মানুষ সবারই যেন পরিচিতির বাজারে টিকে থাকার আলাদা লড়াই। কে কত বড়, কে কাকে চেনে, কে কাকে চেনাতে পারে, এই প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো কাজের চেয়ে প্রচারটাই বড় হয়ে ওঠে।
অথচ দিন শেষে মানুষ মনে রাখে কাজ, পরিচিতির দম্ভ নয়। মনে রাখে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, মানুষের পাশে থাকার দায়বদ্ধতা, আর মনে রাখে সেই মানুষটিকে যিনি নিজের পরিচয় জাহির করতে নয়, নিজের দায়িত্ব পালন করতে মাঠে নেমেছিলেন।
আমি সবাইকে চিনি না, সবাইও আমাকে চিনবে না। এতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। প্রয়োজন হলে পরিচিত হব, প্রয়োজনে কথা বলব। কিন্তু পরিচিতির অহংকারকে সাংবাদিকতার মাপকাঠি বলে মেনে নিতে পারব না।
কারণ, সাংবাদিকতার শক্তি কার সঙ্গে পরিচয় আছে, তাতে নয়, বরং কারও পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কতটা আছে, তাতে।
উফফফ! পরিচিতির এই বাজারে আত্মমর্যাদা নিয়ে টিকে থাকাটাও আজকাল কম বড় সাংবাদিকতা নয়!
লেখক- সহ-সভাপতি, রাঙ্গুনিয়া প্রেস ক্লাব