লেখক-সুব্রত কুমার হাজারী
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
ঋতুরাজ্যের মায়াবী রূপান্তরে প্রকৃতি যখন নতুন করে সেজে ওঠে, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়, নদীর তীরে কাশফুল দোল খায় আর শিশিরস্নাত শিউলি ঝরে পড়ে ভোরের কোমল ঘাসে—তখন প্রকৃতির প্রতিটি অনুষঙ্গ যেন এক পবিত্র আগমনী সংগীতে মুখর হয়ে ওঠে। বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের মৃদুমন্দ প্রতিধ্বনি, হৃদয়ের গভীরে জেগে ওঠে এক অনির্বচনীয় আনন্দ, আর বাঙালির প্রাণে বেজে ওঠে মহামায়ার আগমনী বার্তা। মা দুর্গার আবাহনে বাংলার আকাশ-বাতাস, প্রকৃতি ও মানুষের হৃদয় যেন এক অপার্থিব আনন্দধারায় স্নাত হয়ে ওঠে।
কিন্তু এবারের এই শুভলগ্নে আনন্দের পাশাপাশি আমাদের বিবেকের দুয়ারেও কড়া নাড়ে কিছু গভীর প্রশ্ন। যে পৃথিবী ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় সুন্দর হয়ে ওঠার কথা, সেখানে কেন আজও ধর্মের নামে বিভেদের প্রাচীর ওঠে? কেন মানুষের পরিচয়ের আগে তার ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায়কে দাঁড় করানো হয়? কেন এক মানুষের অশ্রু অন্য মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে না? কেন হিংসা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার কালো ছায়া বারবার সম্প্রীতির নির্মল আকাশকে আচ্ছন্ন করতে চায়? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের আত্মশুদ্ধি, আত্মোপলব্ধি ও মানবিক জাগরণের আহ্বান জানাক।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর এক চিরন্তন মহাকাব্য। দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অশুভ শক্তি যত প্রবলই হোক, শুভবোধের জাগরণ, ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং সত্যের সম্মিলিত শক্তির কাছে তার পরাজয় অনিবার্য। কিন্তু এই অসুর কি কেবল পুরাণের কোনো চরিত্র? আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখি—মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা হিংসা, অহংকার, লোভ, পরশ্রীকাতরতা, অসহিষ্ণুতা ও নিষ্ঠুরতা কি একেকটি অসুরিক প্রবৃত্তি নয়? অন্যের ধর্মকে অবজ্ঞা করা, দুর্বলের ওপর অত্যাচার করা, নিরপরাধ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কিংবা নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা কি অশুভেরই বহিঃপ্রকাশ নয়?
অতএব, দেবীর আরাধনা পূর্ণতা পায় তখনই, যখন তাঁর বন্দনার পাশাপাশি আমরা নিজেদের অন্তরের অন্ধকারকে জয় করার সাধনায় ব্রতী হই। মাটির প্রতিমায় প্রাণের আবাহন যেমন পূজার পবিত্র অনুষঙ্গ, তেমনি জীবন্ত মানুষের প্রতি মমতা, অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি এবং বিপন্নের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও নিহিত রয়েছে ধর্মের এক গভীরতর তাৎপর্য। ধূপের ধোঁয়া, প্রদীপের শিখা, মন্ত্রের উচ্চারণ ও আরতির আলোয় আমাদের হৃদয় যদি নির্মল না হয়, তবে বাহ্যিক আয়োজনের পূর্ণতার মধ্যেও কোথাও যেন অপূর্ণতা থেকে যায়। কারণ, ধর্মের সৌন্দর্য কেবল উপাসনালয়ে নয়—তার সত্যিকারের প্রকাশ মানুষের আচরণে, বিবেকে ও ভালোবাসায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্ম মানুষের আত্মিক আশ্রয়; ধর্ম যেন কখনো মানুষের মধ্যে বিভেদের অস্ত্র হয়ে না ওঠে। বিশ্বাসের পথ ভিন্ন হতে পারে, উপাসনার ভাষা ভিন্ন হতে পারে, প্রার্থনার রীতিও হতে পারে আলাদা; কিন্তু মানুষের চোখের জল, বুকের হাহাকার, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার তো অভিন্ন। যে মা সন্তানের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন, যে পিতা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন, যে মানুষ বিপন্ন প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সামর্থ্য উজাড় করে দেন—তাঁদের মানবিক অনুভূতির কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় নেই। মানবতার এই অভিন্ন সুরই আমাদের সকল ভিন্নতার মধ্যে এক মহামিলনের বন্ধনে আবদ্ধ করে।
মহামায়ার আরাধনায় আমরা শক্তির বন্দনা করি, জ্ঞানের জন্য সরস্বতীর আশ্রয় চাই, সমৃদ্ধির জন্য লক্ষ্মীর কৃপা কামনা করি। সেই আরাধনা আমাদের মনে করিয়ে দিক—প্রকৃত শক্তি দুর্বলকে আঘাত করার মধ্যে নয়, তাকে রক্ষা করার মধ্যে; প্রকৃত জ্ঞান অন্যের বিশ্বাসকে উপহাস করার মধ্যে নয়, ভিন্নতাকে বোঝার উদারতায়; আর প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল নিজের ঘরে প্রাচুর্য সঞ্চয়ে নয়, প্রতিবেশীর ঘরেও আনন্দের আলো পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে। দেবীর চরণে অঞ্জলি দেওয়ার পাশাপাশি যদি আমরা ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারি, অসহায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে পারি, বিপন্ন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি—তবে আমাদের পূজার অর্ঘ্য আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
কবি চণ্ডীদাসের অমর উচ্চারণ—“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”
—শুধু সাহিত্যের পঙ্ক্তি নয়, এটি মানবিক বিবেকের এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। এই বাণী আমাদের শেখায়, মানুষের মর্যাদা তার পরিচয়ের সংকীর্ণ সীমানায় আবদ্ধ নয়। পৃথিবীর কোনো ধর্মই যদি মানুষের প্রতি ঘৃণা, নিরপরাধের প্রতি নিষ্ঠুরতা কিংবা অন্যের অধিকার হরণের অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়, তবে অন্তত আমাদের বিবেকের কাছে সেই আচরণের জবাবদিহি থাকা চাই। নিজের ধর্মে অবিচল থেকেও অন্যের ধর্মকে সম্মান করা যায়; নিজের বিশ্বাসকে ভালোবেসেও অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সহিষ্ণু থাকা যায়। বরং প্রকৃত আত্মবিশ্বাসী মানুষই ভিন্নতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উদারতার পরিচয় দিতে পারেন।
আমরা প্রায়ই বলি, “আমি একা ভালো থাকলে কিংবা ভালো কিছু করলে কী হবে? সমাজের সবাই তো বদলাচ্ছে না!” অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বৃহৎ পরিবর্তনের বীজ অনেক সময় রোপিত হয় একজন মানুষের বিবেকজাগ্রত সিদ্ধান্তে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রদীপটি জ্বালাতে কখনো সমগ্র পৃথিবীর সম্মতির প্রয়োজন হয় না। একটি ছোট্ট প্রদীপও নিজের সীমিত পরিসরে অন্ধকারকে পরাজিত করে। তেমনি একটি আন্তরিক শুভেচ্ছা, একটি সহমর্মিতার হাত, একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা বিপন্ন প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানোর সাহস—এসবই সম্প্রীতির বৃহৎ বৃক্ষের ক্ষুদ্র অথচ মূল্যবান বীজ।
আমাদের এই জনপদ বহু যুগ ধরে নানা ধর্ম, নানা মত, নানা সংস্কৃতি ও নানা বিশ্বাসের মানুষের সম্মিলিত বসবাসে সমৃদ্ধ। পাশাপাশি চলতে চলতে গড়ে উঠেছে আত্মীয়তার মতো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, দুঃসময়ে পাশে থাকার অভ্যাস, আনন্দে অংশ নেওয়ার ঐতিহ্য এবং পরস্পরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার এক মানবিক সংস্কৃতি। এই বন্ধন কোনো এক দিনের সৃষ্টি নয়; এটি বহু দিনের আস্থা, সহাবস্থান ও পারস্পরিক নির্ভরতার ফসল। কোনো সাম্প্রদায়িক উসকানি, স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র কিংবা বিভেদের বিষবাষ্প যেন আমাদের সেই অর্জিত সৌহার্দ্যকে বিনষ্ট করতে না পারে। মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে তার উত্তাপ থেকে পাশের ঘরও নিরাপদ থাকে না; আর প্রতিবেশীর ঘরে আলো জ্বললে সেই আলোয় সমগ্র জনপদই আলোকিত হয়।
তাই সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের নয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করা, গুজব ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণায় কান না দেওয়া, অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। অন্যায় যদি আমার প্রতিবেশীর ওপর নেমে আসে, তবে তার প্রতিবাদে আমার কণ্ঠও উচ্চারিত হোক; কারও উপাসনালয়, বিশ্বাস কিংবা জীবন বিপন্ন হলে মানবতার দায়ে আমি তার পাশে দাঁড়াই। কারণ, অন্যের অধিকার রক্ষা করা মানে নিজের মানবিক মর্যাদাকেও রক্ষা করা।
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে তাই আমাদের প্রার্থনা হোক আরও গভীর, আমাদের আনন্দ হোক আরও ব্যাপ্ত, আর আমাদের হৃদয় হোক আরও উদার। ঢাকের প্রতিটি আঘাত যেন আমাদের অন্তরের জড়তা ভেঙে দেয়; আরতির প্রতিটি শিখা যেন বিবেকের নিভে যাওয়া আলোকে পুনরুজ্জীবিত করে; শিউলির প্রতিটি শুভ্র পাপড়ি যেন পবিত্রতার বার্তা ছড়িয়ে দেয় মানুষের মনে। মায়ের আগমনে শুধু মণ্ডপ সজ্জিত হোক তা নয়, সজ্জিত হোক আমাদের মনও—ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসায়, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমায়, অবিশ্বাসের পরিবর্তে আস্থায় এবং সংকীর্ণতার পরিবর্তে উদারতায়।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের অন্তরের মহিষাসুরকে পরাজিত করার সংকল্প গ্রহণ করি। ধর্মের নামে নয়, ধর্মের মহত্ত্বে; পরিচয়ের অহংকারে নয়, মানবিকতার বিনয়ে; বিভেদের প্রাচীরে নয়, ভালোবাসার সেতুবন্ধনে গড়ে তুলি আমাদের আগামী। এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে একজন মানুষ অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে তার ধর্ম জানতে চাইবে না; যেখানে উৎসবের আনন্দ কোনো একটি সম্প্রদায়ের সীমানায় থেমে থাকবে না; যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও পরস্পরের সুখে হাসবে, দুঃখে কাঁদবে এবং বিপদে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখবে।
মা দুর্গার আগমন আমাদের অন্তরে শুভবোধের জাগরণ ঘটাক, তাঁর অসুরদলনী শক্তি আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক করুক, আর তাঁর করুণাময়ী মাতৃরূপ আমাদের শিখিয়ে দিক—পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই ভালোবাসা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকারী।
শারদীয় দুর্গোৎসবের পবিত্র লগ্নে সকলের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও প্রীতি। আমাদের উৎসব হোক সর্বজনীন আনন্দের, আমাদের ধর্ম হোক মানবকল্যাণের, আমাদের শক্তি হোক ঐক্যের, আর আমাদের পরিচয় হোক—আমরা মানুষ, আমরা পরস্পরের আপনজন।
শুভ হোক শারদ, শারদক্ষণে
মানুষের জয় হোক, সম্প্রীতির জয় হোক, মানবতার জয় হোক।