আব্বাস হোসাইন আফতাব :
মায়ের কোলে চার বছরের ছোট্ট মেয়ে ইনারা জাহান চৌধুরী। অবুঝ শিশুটির নিষ্পাপ দৃষ্টি বারবার চারেপাশে ঘুরে ফিরে কাকে যেন খুঁজছে। মা ঝুমা আকতার ইনারাকে শক্ত করে ধরে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে চোখের জল সামলানোর চেষ্টা করছেন। যে বয়সে ইনারার বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কিংবা মেলায় ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে সে চার মাস ধরে মায়ের হাত ধরে ঘুরছে রাজপথে,বাবার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে।
রাঙ্গুনিয়ার জনপ্রিয় যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন আজ চার মাস পার হলো। কিন্তু সময় গড়ালেও বিচারের চাকা যেন থমকে আছে এক জায়গায়। কয়েকজন আসামী ধরা পড়লেও মূল আসামিরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বিচারহীনতার প্রতিবাদে মঙ্গলবার ( ১৩ অক্টোবর) সকালে উপজেলা সদরের ইছাখালি এলাকায় আয়োজিত এক মানববন্ধনে চার বছরের ইনারাকে কোলে নিয়ে উপস্থিত হন নিহত মাসুদের স্ত্রী ঝুমা আকতার।
মানববন্ধনে উপস্থিত শত শত মানুষের চোখ তখন আটকে যায় ওই ছোট্ট ইনারার দিকে। শিশুটি এখনো বোঝে না ‘বিচার’ শব্দটির অর্থ কী, কিন্তু সে ঠিকই বোঝে তার বাবা আর কোনো দিন বাড়ি ফিরে তাকে জড়িয়ে ধরবে না।
মানববন্ধনে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বুকফাটা কষ্টে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বক্তব্য রাখেন নিহত মাসুদের স্ত্রী ঝুমা আকতার। চার বছরের শিশু ইনারাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাক্রুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আজ চার মাস হয়ে গেল, আমার ছোট্ট মেয়েটা প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে বাবার কথা জিজ্ঞেস করে। আমি ওকে কী সান্ত্বনা দেব? চার মাসেও পুলিশ মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারল না! হত্যাকারীরা কি এতটাই প্রভাবশালী? আমরা কি কখনো বিচার পাব না? পুলিশ কি এই অবুঝ শিশুটার কান্না শুনতে পায় না?”
ঝুমা আকতারের এই বক্তব্যে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও প্রতিবেশীদের চোখেও জল চলে আসে। মাসুদের হত্যাকাণ্ডের পর চার মাসেও মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করতে পারায় সবার বুকেই জমছে ক্ষোভের পাহাড়।
চার মাস আগে একদল আততায়ী নৃশংসভাবে হত্যা করে মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে। ঘটনার পর পরই এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। মামলার পর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দ্রুততম সময়ে সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, চার মাস পার হয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান বা উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। মূল আসামিরা অধরাই থেকে গেছে।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন বেতাগী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হোসাইন মিনারের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন নিহত মাসুদের বড় ভাই ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী, নিজামুল হক চৌধুরী ও জাহেদ চৌধুরী। মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাজনৈতিক ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাসুদ ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ও অমায়িক মানুষ। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ চার মাসেও প্রধান আসামিদের
গ্রেপ্তার করা যায়নি। মানববন্ধনে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইউছুপ চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী ইলিয়াস সিকদার, পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির খোকন বক্তব্য দেন।
মানববন্ধনের আয়োজক ও স্থানীয় যুবদলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় আর কোনো আশ্বাস নয়, এবার চাই দৃশ্যমান বিচার।
সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, অবিলম্বে যদি মাসুদ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের গ্রেপ্তার না করা হয়, তবে কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মানববন্ধন শেষ হলেও ইছাখালির বাতাসে তখনো ভাসছিল ঝুমা আকতার ও তার চার বছরের শিশুকন্যা ইনারার নির্বাক আকুতি। যে শিশুটি এখনো ঠিকমতো জীবন চিনতে শেখেনি, সে কি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি এই প্রশ্নের উত্তর কখনো পাবে? নাকি মাসুদের রক্তমাখা স্মৃতির সাথে ইনারার এই চোখের জলও বিচারহীনতার আড়ালে হারিয়ে যাবে?