আব্বাস হোসাইন আফতাব :
একসময় একই বেঞ্চে বসে ক্লাস করেছেন। টিফিন ভাগাভাগি করেছেন। স্কুল ছুটির পর একসঙ্গে হেঁটেছেন বাড়ির পথে। তারপর সময় গড়িয়েছে। কেউ হয়েছেন প্রকৌশলী, কেউ ব্যাংকার, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ ব্যবসায়ী। কেউবা পাড়ি জমিয়েছেন হাজার মাইল দূরের কোনো দেশে। ব্যস্ত জীবনের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল সেই বন্ধুত্বের অনেক গল্প।
কিন্তু বন্ধুত্বের বয়স হয় না। তাই ৩০ বছর পর আবারও তাঁরা এক মোহনায়।
চট্টগ্রাম নগরীতে অনুষ্ঠিত হলো রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৬ সালের এসএসসি ব্যাচের অভিষেক। সম্প্রতি নগরের সিইসি সার্কেলের ইউনেস্কো সেন্টারের পঞ্চম তলায় সাভোরিয়া রেস্টুরেন্টে বসেছিল এই পুরোনো বন্ধুদের মিলনমেলা।
‘শরতের রিমঝিম ছন্দে এসএসসি ’৯৬ ব্যাচ’ শিরোনামের আয়োজনে যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য থমকে গিয়েছিল সময়। পঞ্চাশের ঘরে পা দেওয়া মানুষগুলো ফিরে গিয়েছিলেন সেই কৈশোরে। কেউ পুরোনো বন্ধুকে দেখে জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন, আবার কেউ হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছেন।
পরিচয়ের আড়ালে তিন দশকের গল্প
কবি ও শিক্ষক পারভীন আকতারের পরিচালনায় পরিচিতি পর্ব দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। পরিচয় দিতে গিয়ে শুধু নাম বা পেশা নয়, উঠে আসে তিন দশকের পথচলার গল্প। কে কোথায় ছিলেন, কীভাবে জীবন বদলেছে, কে সংসার-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন, আবার কে পেশাগত প্রয়োজনে দেশ ছেড়েছেন, এসব গল্পেই জমে ওঠে আড্ডা। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্যবসায়ী সুলতান মালেক টিপু।
এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। শিক্ষক ও কণ্ঠশিল্পী রাতুল বৈদ্য, কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দীন আল আজাদসহ অন্যদের কণ্ঠে পুরোনো দিনের গান যেন বন্ধুদের ফিরিয়ে নেয় স্কুলজীবনের সেই দিনগুলোতে। শিউলী বড়ুয়া ও কবি পারভীন আকতারের আবৃত্তি এবং স্বরচিত কবিতা পাঠও যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
পেশা আলাদা, বন্ধুত্ব একই
তিন দশকে বদলে গেছে সবার জীবন। কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যাংকার, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ করপোরেট কর্মকর্তা, আবার কেউ ব্যবসায়ী। তবু পরিচয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি রয়ে গেছে একই, তাঁরা সবাই এসএসসি ’৯৬ ব্যাচের বন্ধু।
অনুষ্ঠানে প্রকৌশলী আতিকুর রহমান, প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার চৌধুরী, প্রকৌশলী সুকান্ত বড়ুয়া, ব্যাংকার রুবেল তালুকদার, ব্যাংকার সোয়াব হাশেমী, মো. সেলিম চেয়ারম্যান, করপোরেট কর্মকর্তা টিটু, ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন পারভেজ, শিউলী বড়ুয়া, সুমিত্রা বড়ুয়া, নন্দিনী মুৎসুদ্দী, সুচিতা মুৎসুদ্দী, অপি, পাপিয়া, রেশমা, আকতার, মুনমুন, রাজ্জাক, ফয়েজ, ইকবাল, দিদার, ওমর শরীফ, সালাউদ্দীন, লোকমান, আজাদ, হুমায়ুন, হাজী গিয়াস, হিরু, ইরাক, সুমেধ, দেবাশীষ, মেজবাহ, হারুন, ইরশাদ নূর সুমন, পূর্ণিমা, রাজন, সুমন মুৎসুদ্দি, জাবেদ, মো. বেলাল, জাহাঙ্গীর, শংকর, মোস্তফা রেজা, রূপন, মোয়াজ্জেম ও মনসুরসহ ব্যাচের অর্ধেকের বেশি সদস্য অংশ নেন।
দূরত্ব ঘুচিয়ে পর্দার ওপারেও বন্ধুত্ব
সবাই অবশ্য সশরীরে আসতে পারেননি। কানাডাপ্রবাসী জোনায়েদ মুরাদ জনি, আমেরিকাপ্রবাসী শিরিন আকতার, আবীর দাশ ও শাহ ইমরান, ইউএইপ্রবাসী গিয়াস এবং ওমানপ্রবাসী সুজন ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও তাঁদের কণ্ঠে ছিল একই উচ্ছ্বাস। আয়োজনের পরামর্শ, সময় ও আর্থিক সহযোগিতায় তাঁরাও ছিলেন পাশে। প্রযুক্তি যেন দূরত্বকে ছোট করে দিয়েছিল, আবারও একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিল পুরোনো বন্ধুদের।
এই মিলনমেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার। কোনো বন্ধু অসচ্ছল হলে বা বিপদে পড়লে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।
ভালো থাকা শুধু নিজের জন্য নয়, বন্ধুর ভালো থাকাকেও নিজেদের দায়িত্ব মনে করছেন তাঁরা। তিন দশক পরের এই মিলন তাই নিছক আড্ডা বা বিনোদনের আয়োজন হয়ে থাকেনি, পেয়েছে মানবিক বন্ধনের নতুন অর্থ।
আবারও দেখা হবে স্কুলের মাঠে
অনুষ্ঠান শেষে ব্যাচের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়।
তবে নগরীর এই আয়োজনই শেষ নয়। আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সপরিবারে আরও বড় পরিসরে পুনর্মিলনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
তখন হয়তো শহরের কোনো রেস্টুরেন্ট নয়, তাঁদের দেখা হবে সেই পুরোনো স্কুলের মাঠে। যে মাঠে কেটেছে কৈশোরের অসংখ্য বিকেল। যে স্কুলের করিডরে জন্ম নিয়েছিল বন্ধুত্বের গল্প।
৩০ বছর পর সেই বন্ধুরাই আবার ফিরবেন নিজেদের শিকড়ে। বয়স তখন পঞ্চাশের ঘরে, কিন্তু বন্ধুত্বের কাছে তাঁরা হয়তো আবারও সেই স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী।