নীলা কোথায় তুমি?
এতক্ষণ ধরে খেলতে হয়!
এখনো স্নান করোনি,
খাবে কখন শুনি!!!
কোনো কথাই শুনতে চায় না মেয়েটা!
এমনি করে প্রতিনিয়তই ছুটাছুটি করে নীলা।
খাওয়া -দাওয়া, কোনো কিছুর বালাই নেই তার,
সারাক্ষণ হাসি গানে, হৈ-হুল্লোড় করে মাতিয়ে রাখে নীলা।
বাবা তার সব কিছু মেনে নিলেও,
মা’র বকুনি যেন তার নিত্য দিনের,
নীলা প্রথমে মন ভারী করে থাকলেও,
ক্ষণিকেই আবার মুচকি হেসে
আবার সেই হইচই।
এভাবেই বাবা-মা’র আদর-শাসনে বড় হচ্ছিলো নীলা,
সবেমাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে সে,
তবে তার শরীর, শরীরের গঠনে মনে হচ্ছিলো –
সে যেন অষ্টাদশী নারী!
পাড়া-পড়শীর ঘুম নেই,
কত প্রশ্ন, কত ভাবনা!
এখনো বিয়ে হয়নি মেয়েটির ??
কানাকানি, মাতামাতি, আরো কত কী!
এর কোনো কিছুই জানা নেই নীলার।
সেই ছোট্ট বেলার মতো না হলেও,
স্কুল থেকে এসে তার খেলাধুলা,
বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে থাকছেই।
আচমকা একদিন বিকেল বেলা!
বাসার সামনেই বান্ধবিকে নিয়ে খেলছিল সে,
অচেনা অতিথি দু’জন ঘুরাফেরা করছে,
তা দেখে ছুটে আসছে নীলা,
কে আপনারা, কাকে চাচ্ছেন ?
সাদামাটা সহজ প্রশ্ন –
নীলাদের বাড়ি যেন কোনটি?
কেন বলুনতো!
যাকগে, নিজের পরিচয় না দিয়েই বলে-
এই যে পুরোনো সিঁড়িটা দেখতে পাচ্ছেন,
এটিই নীলাদের বাড়ি।
যখন সন্ধ্যা নামে, নীলা যায় ঘরে।
অবাক চোখে দেখছে সে !
অচেনা অতিথি দু’জন ভোজন বিলাসে মত্ত!
মা’কে সে প্রশ্ন করে, ওরা কে মা?
ওরা! প্রণাম কর, প্রণাম কর…
ওরা তোর শ্বশুর বাড়ির স্বজন!
এসব কী বলছো মা!
কেন দুষ্টুমি করছো?
মা, বলোনা ওরা কেন আসছে,
যা বলছি কানে যাচ্ছেনা তোর??
যা, যা -একটু সেজেগুজে আয়।
তখনও কিছু বুঝে ওঠতে পারেনি নীলা।
দৌড়ে ছুটে যায় বাবার কাছে।
আচ্ছা বাবা, মা এসব কী বলছে বলতো…
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
মা’রে তোর মা ঠিকই বলছে।
তুমিও দুষ্টুমি করছো বাবা!!
না’রে মা, দুষ্টুমির কিছু নেই,
ওদের বড় ছেলে, ভালো চাকরি করে,
ছোট একটি ভাই, দুটি বোনও আছে তার।
তুই বড় বউ হ’বি,
তোকে নাকি রাজরানী করে রাখবে!
আচ্ছা বাবা আজ তোমাদের কী হয়েছে?
কী সব আজগুবি কথা বলছো।
ছাড়োতো এসব বাবা।
এসো আমার পড়ার ঘরে,
অনেকগুলো অঙ্ক দেখিয়ে দিতে হবে তোমাকে।
বাবা চুপিচুপি মেয়ের ঘরে যায়,
দেখে মেয়েটি ঠিকই অঙ্ক নিয়ে বসে গেছে।
অঙ্ক দেখার ফাঁকে বাবা বলে,
মা জানিস, ওরা নাকি তোকে অনেক দূর পড়াবে।
নীলা বলে, ওরা কী ঠিক তোমার মত আদর করবে বাবা!!
এ প্রশ্নের উত্তর বাবার কেন,
সবারই অজানা।
ছুটাছুটি, হৈ-হুল্লোড় করা মেয়েটি আজ,
এই ছোট্ট বয়সেই ঘরের বউ !
কত দায়িত্ব তার !
এটা করো, ঐটা করো,
না না এটা করোনা, এখানে যেওনা,ঘরের বউয়ের ঐখানে যেতে নেই, ঐটা করতে নেই।
বিচিত্র শাসনে, নির্দেশে জর্জরিত সে।
শ্বশুর তাকে বাড়ির পাশের স্কুলেই ভর্তি করে ,
তেমন একটা স্কুলে যাওয়া হতো না তার,
আর খেলাধুলা, বান্ধবীদের সাথে আড্ডা!
নীল আকাশ, চাঁদনি রাত,
কান পেতে শোনা বাতাসের গান,
জোনাকির মিটিমিটি আলো,
কোনো কিছুই সঙ্গী নেই নীলা’র।
শিশুর কোলে আর একটি শিশু!
হ্যাঁ, বিয়ের এক বছরেই মা হয় নীলা।
বয়স যাই হোক, নীলা এখন মা!
কতো বড় সে এখন!
কতো দায়িত্ব তার!
কান্না শুনলেই ছুটে যাওয়া, রাতজাগা, ঘুমপাড়ানো।
আর সংসার! তা তো আছেই!
না, না ছাড় নেই তার, বড় বউ বলে কথা!
এদের নাকি ক্লান্তি থাকতে নেই!
নীলার শিশুটির নাম রাখা হয় -মুক্তি
কেননা, এমন দাসত্বের খাঁচা যেন তার মেয়েকে আবদ্ধ না রাখে,
সে যেন তার আপন ডানায় শঙ্খচিলের ন্যায়,
যেতে পারে এদিক- সেদিক,
যেন সে স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে যেতে পারে বহুদূর… ;
যেথায় পাহাড় জলে ঝর্ণা নাচে,
যেথায় সমুদ্রের টানে হৃদয় কাঁপে।
অনেকটা পাল্টে গেছে নীলা!
জীবনের মানে কী!
দাসত্ব কী!
মুক্তি কী!
সবই এখন জানা তার।
পিঠ ঠেকে ঠেকে অনেক কিছুই শিখে ফেলেছে সে,
অনেকের মিষ্টি কথাও এখন তেঁতো লাগে!
সময় পেরিয়ে গেলেও সে এখন স্বাধীনচেতা!
এখন আর কোনো শাসন- শিখলে সে বন্দী থাকতে চায়না,
এ জগতটাতে সে আবার উপভোগ্য করে তুলতে চায়।
এতে কারো মনভাঙ্গার কারন হলেও,
কোনো মাথা ব্যথা নেই তার।
কারন সে জানে-
অল্পে তুষ্ট থাকলে,কারো প্রতি প্রত্যাশা না থাকলে,
কারো বিকৃতভাষার সম্বোধন মনে না মাখলে,
সবচেয়ে বড় কথা- বিনয়ী হলে…
কষ্ট পাওয়ার সুযোগ নেই!
সুখে থাকুক নীলা,
মুক্তির মুক্তি হোক,
ভালো থাকুক সবাই,
দাসত্ব নয় !!!
ভালোবাসার জয় হোক।
লেখক: সুব্রত কুমার হাজারী
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার,রাঙ্গুনিয়া।