সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি’ এ সংক্রান্ত একটি বিধিমালার খসড়া এরই মধ্যে অনুমোদন করেছে।
সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে এবং লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমবে।
সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং আনসারের মতো শৃঙ্খলা বাহিনী বাদে বাকি সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে অভিন্ন নম্বর বণ্টন করতে যাচ্ছে সরকার।
গত রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়।
সরকার বলছে, নিম্ন গ্রেডের চাকরিতে ‘প্রক্সি’ বা অন্যের পরীক্ষা দেওয়ার জালিয়াতি ঠেকাতেই সব চাকরিতে এক মানবণ্টনে পরীক্ষা নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত পদ্ধতির প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চাকরিপ্রত্যাশীরা ক্ষোভ জানিয়েছেন।
বিষয়টি মঙ্গলবার জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পয়েন্ট অব অর্ডার গ্রহণ করেননি। তিনি রুলিং দিয়ে জানান, সংসদে চলমান নয় এমন বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার হয় না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দিয়েছেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
পয়েন্ট অব অর্ডারে পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি এবং লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানো মেধার পরিবর্তে কোটার দিকে ধাবিত হওয়া। প্রক্সি প্রতিরোধের যুক্তি দেখালেও এর মাধ্যমে প্রশাসনে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয়করণের রাস্তা সুগম হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এনসিপির আরেক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, মৌখিক পরীক্ষায় মুখে চিনে নম্বর দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, লিখিত পরীক্ষায় ১০০ এর মধ্যে ৬০ পাওয়া প্রার্থীকে ভাইভায় ১৯ দিয়ে এবং ৪০ পাওয়া প্রার্থীকে ভাইভায় ৪০ দিয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে দিতে পারে। তাই এই নম্বর বণ্টন গ্রহণযোগ্য নয়।
সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদার জানিয়েছেন, নিয়োগ পরীক্ষার জন্য এমন বিশেষ মানবণ্টন বিধিমালা করা ভালো হবে না। এতে সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়বে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, নিয়োগের মানোন্নয়নের জন্যই মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন যে, ভাইভা যেহেতু সাবজেক্টিভ, তাই সেখানে পছন্দের কাউকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
তবে চাকরির জন্য শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয় বলে তিনি দাবি করেন। কোনো নিয়োগে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম পাওয়া গেলে তা গণমাধ্যমকে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রথম থেকে নবম গ্রেড এবং কিছু ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৩তম গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এর বাইরে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সরকারি সংস্থাগুলোর ১০ থেকে ২০তম গ্রেডে সরাসরি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ পরীক্ষা হয়।
সচিবালয় নিয়োগ বিধিমালা-২০১৪ অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ম থেকে ১৬তম গ্রেডের পদে লিখিত পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষা হয় ১০ নম্বরের। এছাড়া ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের ৪০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে ১০ নম্বরের ভাইভা হয়।
অন্যদিকে সংযুক্ত অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং দপ্তরের কমন পদ নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী, ১১টি পদের জন্য ৭০ নম্বরের লিখিত এবং ৩০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। বর্তমানে ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ।
অনুমোদিত খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, ১১ থেকে ১২তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরে এবং মৌখিক পরীক্ষা হবে ৫০ নম্বরে। এক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে।
১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষা হবে ৬০ নম্বরে এবং মৌখিক পরীক্ষা হবে ৪০ নম্বরে, যেখানে পাস নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ। এছাড়া ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের লিখিত পরীক্ষা ২৫ নম্বরে এবং মৌখিক পরীক্ষাও ২৫ নম্বরের হবে।
নতুন বিধিমালায় কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীকে ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস করলে তবেই মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
এছাড়া সাঁটলিপিকার-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদের জন্য সাঁটলিপি ও কম্পিউটার মুদ্রাক্ষর পরীক্ষার জন্য আলাদা নম্বর ও গতি নির্ধারিত রয়েছে। ইংরেজি সাঁটলিপিতে মিনিটে ৮০ শব্দ এবং বাংলায় ৫০ শব্দ লেখার গতি নির্ধারিত। উভয় পরীক্ষার মোট নম্বর ১০০ করে এবং ন্যূনতম পাস নম্বর ৮০ শতাংশ।