প্রতিবেদন: সৌরভ সাহা- ডেঙ্গু জ্বর ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত একটি মশাবাহিত রোগ। সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এ ভাইরাস ছড়ায়। সাধারণত ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ গুরুতর জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বিপদসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের পর সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং তা ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর কী?
ডেঙ্গু হলো ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ। এডিস মশা—বিশেষ করে Aedes aegypti—এই ভাইরাসের অন্যতম প্রধান বাহক। ডেঙ্গু সাধারণত সরাসরি একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের মধ্যে ছড়ায় না; আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো মশা পরবর্তীতে অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দৈনিক তথ্য প্রকাশ করে এবং ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় নির্দেশিকাও রয়েছে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে হঠাৎ জ্বরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
* উচ্চমাত্রার জ্বর
* তীব্র মাথাব্যথা
* চোখের পেছনে ব্যথা
* পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
* শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগা
* বমি বমি ভাব বা বমি
* ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি
* কখনও গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
এসব উপসর্গ অনেক সময় ফ্লু বা অন্যান্য জ্বরের মতো হওয়ায় শুরুতে ডেঙ্গু শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে এসব উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কখন ডেঙ্গু বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে?
ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জ্বর কমে গেলেই যে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন, তা ধরে নেওয়া যাবে না। অসুস্থতার কয়েক দিনের মধ্যে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর বিপদসংকেত দেখা দিতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, তীব্র পেটে ব্যথা, বারবার বমি, মাড়ি থেকে রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতা এবং বমি বা পায়খানায় রক্ত থাকা গুরুতর সতর্কসংকেত।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে বসে না থেকে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শক, মারাত্মক রক্তপাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ডেঙ্গু হলে কী করবেন?
ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর বা ব্যথার ওষুধ নিজে থেকে না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ডেঙ্গু সন্দেহ হলে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ রক্তপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় এসব ওষুধ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।
বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্রসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
এছাড়া—
দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রয়োজনে মশা নিরোধক ব্যবহার করতে হবে।
ঘরের জানালা-দরজায় নেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
সম্ভব হলে শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরতে হবে।
বাড়ির ছাদ, বারান্দা, আঙিনা ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
পরিবারের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম ধাপ
ডেঙ্গু শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; মশার বংশবিস্তার রোধে পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়ির ভেতর পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং গুরুতর বিপদসংকেত দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করাই নিরাপদ। কারণ গুরুতর ডেঙ্গু দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
সতর্ক থাকুন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করুন, ডেঙ্গুর লক্ষণকে অবহেলা করবেন না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজের পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীকেও সচেতন করুন।