“আমি কিছু মনে করিনি, করিও না—আমি অর্নবের মা।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ৩৭ বছরের দীর্ঘ এক মায়ের ভালোবাসা, অপেক্ষা, নির্ঘুম রাত, সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সন্তানের প্রতি নিঃশর্ত দায়িত্ববোধের গল্প।
অর্নব একজন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি তাঁর মা ডা. বাসনা মুহুরীর প্রথম সন্তান। আগামী ২১ আগস্ট অর্নবের ৩৭ বছর পূর্ণ হবে। অর্নবকে ঘিরে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে ডা. বাসনা মুহুরী তুলে ধরেছেন একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মায়ের না-বলা অনেক কষ্টের কথা।
তিনি লিখেছেন, একজন নারীর জীবনে “মা” পরিচয়টি কতটা আকাঙ্ক্ষিত ও আবেগের। সন্তানের মুখে প্রথম “মা” ডাক শোনার অপেক্ষা তাঁরও ছিল। কিন্তু অর্নব তাঁকে সেই ডাকটি সেভাবে দিতে পারেনি। একসময় এ অপূর্ণতা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে অর্নবই তাঁকে শিখিয়েছে—শুধু মুখের “মা” ডাকেই মাতৃত্বের পূর্ণতা নয়; সন্তানের চোখের ভাষা, মুখের হাসি, অভিব্যক্তি ও ভালোবাসার মধ্যেও একজন মা তাঁর সন্তানের ভালোবাসা অনুভব করতে পারেন।
ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, অর্নব তাঁর কাছে শুধু সন্তান নয়—তিনি তাঁর আত্মজ, তাঁর প্রাণ। তাই সমাজের নানা কটূক্তি, অবহেলা কিংবা কুসংস্কার তাঁকে দীর্ঘদিন ভেঙে রাখতে পারেনি।
অর্নবকে নিয়ে চলার পথে তাঁকে শুনতে হয়েছে—“পাগল”, “পাপের ফসল”সহ নানা অপমানজনক মন্তব্য। সমবয়সী অনেক শিশুকে অর্নবের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হয়নি। এমনকি কখনো কখনো আত্মীয়-স্বজনের অনুষ্ঠানে অর্নবকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাময়িক কষ্ট পেলেও তিনি মনে করেছেন, সমস্যাটি অর্নবের নয়; সমস্যাটি সমাজের ভুল ধারণা ও অজ্ঞতায়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অটিজম কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, কোনো অশুচিতা নয়। এটি স্নায়বিক বিকাশের একটি ভিন্নতা। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষদেরও সমাজে সম্মান, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
অর্নবকে বড় করতে গিয়ে অসংখ্য নির্ঘুম রাত পার করেছেন তাঁর মা। সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসা, বিকাশ ও নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তার পাশাপাশি তাঁকে চালিয়ে যেতে হয়েছে নিজের পেশাগত জীবনও।
দিনের দায়িত্ব শেষে ঘরে ফিরে সবসময় পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কখনো কোনো অতিথির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি, কখনো নিজের কষ্ট লুকিয়ে হাসতে পারেননি। আর সেই মুহূর্তগুলোতেই তাঁকে শুনতে হয়েছে নানা অভিযোগ ও অপবাদ।
“ভালো করে হাসিমুখে কথা বলিনি”, “পরিবারের সঙ্গে সময় দিই না”—এমন অভিযোগও শুনতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে, “আপনার একটা সন্তান প্রতিবন্ধী—এত হাসিখুশি থাকেন কী করে?”
তাঁর ভাষায়, একজন মায়ের মুখের হাসি দেখে তাঁর ভেতরের কষ্ট বোঝা যায় না। একজন মা অনেক সময় নিজের কান্না লুকিয়ে শুধু সন্তানের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করেন।
অর্নবের জন্য অনেক সামাজিক অনুষ্ঠান বা আমন্ত্রণে যেতে পারেননি ডা. বাসনা মুহুরী। তাতেও তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর কাছে অর্নবই ছিল অগ্রাধিকার।
এক আত্মীয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি জানান, ওই আত্মীয় তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায়ই চিকিৎসার জন্য আসতেন। কোনোদিন সিরিয়াল বা ফি নেওয়া হয়নি। একদিন সন্তানদের দেখিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে বলা হয়েছিল—“পয়সা কত কামাবেন, বেড়াতে পারেন না!”
কথাটিও তিনি মনে রাখেননি। কারণ তাঁর মতে, যিনি কথাটি বলেছেন, তিনি তাঁর জীবনের ভেতরের সংগ্রাম জানতেন না। জানতেন না অর্নবকে নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের লড়াই, অগণিত নির্ঘুম রাত কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ।
ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, “আমার মতো সন্তান তাঁদের নেই। তাই হয়তো আমার কষ্টের গভীরতাও তাঁরা বুঝবেন না।”
আজ তিনি নিজেকে একজন গর্বিত মা হিসেবে পরিচয় দিতে চান। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি অর্নবের মা।
অর্নব তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে নিয়ে পরিবার ও সমাজে পথ চলতে হয়। শিখিয়েছে কীভাবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
অর্নবের জন্য এবং অর্নবের মতো অন্য সন্তানদের জন্য কাজ করতে গিয়েও তাঁকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশায় তিনি এসব কাজ করেননি।
তাঁর ভাষায়, “আমি কিছু পাওয়ার জন্য কোনো কাজ করিনি, করিও না। আমার পরিচয়—আমি অর্নবের মা। আর আমার পেশা—শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।”
অর্নব এখন তাঁদের পরিবারের সবার প্রিয়জন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্ন তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়—তিনি যখন আর থাকবেন না, তখন অর্নব কেমন থাকবে?
এই জায়গাতেই তাঁর আশা ও ভরসা তাঁর ছোট ছেলে। অর্নবের ছোট ভাই তাঁর মাতৃত্বের অন্য এক পূর্ণতা এনে দিয়েছে এবং তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে সেও অর্নবের পাশে থাকবে।
তবে শুধু পরিবারের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে না দিয়ে সমাজকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষরা সমাজের বাইরের কেউ নন। তাঁরা ছিলেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ—সব জায়গাতেই তাঁদের জন্য অনুকূল ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের পরিবারের প্রতি তাঁর আবেদন—করুণা নয়, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। সহযোগিতা করতে না পারলে অন্তত হেয় করবেন না।
কারণ একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মা শুধু সন্তানের জন্যই লড়াই করেন না; তাঁকে অনেক সময় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও লড়তে হয়।
ডা. বাসনা মুহুরীর এই আত্মকথনের সবচেয়ে বড় আবেদন—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের পাশাপাশি তাঁদের মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি লিখেছেন, “আমাদের এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান সৃষ্টিকর্তার পাঠানো বিশেষ উপহার।”
তাঁর প্রার্থনা, কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান যেন কখনো অযত্ন, অবহেলা, অপমান কিংবা নিগ্রহের শিকার না হয়।
সমাজের প্রতি তাঁর আহ্বান—কুসংস্কার দূর করে এমন একটি সমন্বিত সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না।
“No One Left Behind”—কেউ পিছিয়ে থাকবে না।
সবশেষে একজন মায়ের পরিচয়েই ফিরে আসেন ডা. বাসনা মুহুরী—
“আমি কিছু মনে করিনি, করিও না।
কারণ আমি অর্নবের মা।”
**ডা. বাসনা মুহুরী ম্যাম এর ফেইজবুক থেকে সংগৃহীত।।।