আব্বাস হোসাইন আফতাব :
মাঠজুড়ে সবুজ লতা। লতার নিচে উঁকি দিচ্ছে বড় বড় তরমুজ। কোথাও ছোট, কোথাও বেশ বড়। গাছের ডগায় আবার ফুটেছে অসংখ্য ফুল। দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, এ বুঝি তরমুজের স্বাভাবিক মৌসুম। কিন্তু না, এটি গ্রীষ্মকালীন তরমুজের ক্ষেত। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের উত্তর পোমরা গ্রামের এই জমিতে নতুন ফসলের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষক নুর উদ্দিন ও মো. সেলিম।
এক কানির জমিতে তাঁরা চাষ করেছেন বিগবাইট ও সূর্যডিম জাতের গ্রীষ্মকালীন তরমুজ। এ এলাকার কৃষকদের কাছে ফসলটি একেবারেই নতুন। তবে নতুন এই ফসলই এখন কৃষক নুর উদ্দিনের মনে তৈরি করেছে নতুন স্বপ্ন।
জমিতে দাঁড়িয়ে নুর উদ্দিন বলছিলেন, ‘‘এ এলাকায় গ্রীষ্মকালীন তরমুজ আগে তেমন চাষ হয়নি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দিলোয়ারা বেগমের পরামর্শে চাষে আগ্রহী হই। এখন ফলন আসতে শুরু করেছে। এ মুহূর্তে ১০০ থেকে ১৫০টি তরমুজ আছে। প্রতিটির ওজন দুই থেকে তিন কেজি, কোনো কোনোটি তারও বেশি।’’
তাঁর চোখে তখন হিসাবের ঝিলিক। একেকটি তরমুজ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কত টাকা আসতে পারে, সেই হিসাব কষছেন তিনি। শুধু বর্তমান ফলন নয়, সামনে আরও ফলনের আশা। কারণ জমিতে এখনো রয়েছে অসংখ্য ফুল।
নুর উদ্দিন বলেন, ‘‘সব ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারলে এক লাখ টাকার মতো তরমুজ বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।’’
এই আশার পেছনে রয়েছে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা। চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি অফিস এ জমিতে প্রদর্শনী স্থাপন করেছে। সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার, জৈব বালাইনাশক, হলুদ আঠালো ফাঁদ, ফেরোমন ফাঁদ ও মালচিং পেপার।
মালচিং পেপারে ঢাকা জমির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তরমুজের লতা। লতার নিচে তৈরি হচ্ছে ফল। জমিতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কমাতে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। এতে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রদর্শনী জমি পরিদর্শনে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুকুমার বড়ুয়া ও উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা প্রণব চন্দ্র মজুমদার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘‘আমরা কৃষকদের খোরপোশের কৃষি বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক কৃষির দিকে যেতে পরামর্শ দিচ্ছি। এতে তাঁরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন। গ্রীষ্মকালীন তরমুজসহ উচ্চ মূল্যের ফসল চাষে আগ্রহী কৃষকদের আমরা উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’’
কৃষি বিভাগের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, একই জমিতে প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ও লাভজনক ফসলের সম্ভাবনা তৈরি করা। গ্রীষ্মকালীন তরমুজের মতো উচ্চ মূল্যের ফসল সফলভাবে চাষ করা গেলে রাঙ্গুনিয়ার কৃষকদের আয় বাড়ানোর নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
নুর উদ্দিনের জমিতে এখন প্রতিদিনই নতুন গল্প তৈরি হচ্ছে। আজ যে ফুল, কয়েক দিন পর সেটিই হতে পারে একটি বড় তরমুজ। আর প্রতিটি তরমুজ কৃষকের কাছে শুধু একটি ফল নয়, পরিবারের বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা।
ফসল ঘরে ওঠার দিন এখনো আসেনি। তবে সবুজ লতার ফাঁকে ঝুলে থাকা তরমুজগুলো যেন এরই মধ্যে বলে দিচ্ছে, রাঙ্গুনিয়ার মাঠে কৃষির পুরোনো গল্পের পাশে নতুন একটি গল্পের শুরু হয়েছে।