আব্বাস হোসাইন আফতাব :
মানুষের প্রকৃত পরিচয় জানা যায় বিপদের মুহূর্তে। বৃহষ্পতিবার ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার পর সেই পরিচয়ই আবারও দিলেন রাঙ্গুনিয়ার সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালক আবুল হাসান বাদশা। যখন অনেকেই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সবাই মোবাইলে ভিডিওতে ব্যস্ত, তখন আহতকে উদ্ধারে সবার আগে এগিয়ে আসেন তিনি। নিজের নিরাপত্তা বা সময়ের কথা না ভেবে মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদই ছিল তার একমাত্র চিন্তা।
আবুল হাসান বাদশা চার বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। জীবন তাকে কখনো সহজ পথ দেখায়নি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে অল্প বয়সেই। বর্তমানে তিনি দৈনিক জমার ভিত্তিতে ভাড়ায় একটি সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিদিনের আয় থেকে মালিকের জমা পরিশোধ করার পর যা থাকে, তা দিয়েই চলে তার সংসার।
মাত্র ১১ মাস আগে নতুন সংসার শুরু করেছেন তিনি। স্বপ্ন ছিল ধীরে ধীরে সব গুছিয়ে নেবেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে তার ভাড়ায় চালিত সিএনজিটি চুরি হয়ে যায়। মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে ঋণ করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন কাজহীন থেকেছেন। সেই ঋণের বোঝা এখনো বহন করছেন। পরে আবার নতুন একটি সিএনজি দৈনিক জমার ভিত্তিতে চালিয়ে জীবনযুদ্ধ শুরু করেন।
এত কষ্টের মাঝেও মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা একটুও কমেনি। কেউ অসুস্থ হলে, দুর্ঘটনায় পড়লে বা বিপদে পড়লে তিনি যতটা সম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করেন। পরিচিতদের ভাষায়, বাদশা একজন সৎ, বিনয়ী ও পরোপকারী মানুষ। মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেন তার স্বভাব। দুর্ঘটনায় তার দ্রুত উপস্থিতি ও মানবিক ভূমিকা আবারও প্রমাণ করেছে, সমাজে এখনো এমন মানুষ আছেন, যারা নিজের লাভ-লোকসানের হিসাব না কষে অন্যের জীবন বাঁচাতে ছুটে যান। এমন মানুষদের কারণেই মানবিকতার আলো এখনো নিভে যায়নি।
সমাজে ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। কারণ, একজন মানবিক মানুষকে সম্মান জানানো মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা নয়, বরং মানবিকতা, সাহস ও দায়িত্ববোধকে সম্মানিত করা। সড়কের এই নীরব বীরকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা অন্যদেরও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে।
নীরবে মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া আবুল হাসান বাদশার মতো মানুষরাই আমাদের সমাজের প্রকৃত সম্পদ। তাদের গল্প যত বেশি ছড়িয়ে পড়বে, ততই শক্তিশালী হবে মানবতার বন্ধন।