আব্বাস হোসাইন আফতাব :
দুই সন্তানকে নিয়ে মেলায় ঘুরছেন প্রবাসী মো. আলী। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছোটাছুটি করছে শিশুরা। তাদের জন্য খেলনা কিনছেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কিনেছেন মিষ্টি জাতীয় নানা ধরনের খাবার। প্রবাসে থাকায় বছরের পর বছর এই মেলায় আসার সুযোগ হয়নি। এবার দেশে থাকায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন বহুদিনের পরিচিত এই আয়োজনে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার রাহাতিয়া দরবারের পাশে ইছামতী বড় দীঘি। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘পরীর দীঘি’ বা ‘মঞ্জিল ভিটা’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আরবি বছরের ১০ মহরম এই দীঘিকে ঘিরে বসে শতবর্ষী এক দিনের মেলা। শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এবারের মেলায়ও ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শিশু থেকে প্রবীণ, সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মেলার পাশেই রয়েছে রাহাতিয়া দরবার। স্থানীয় প্রবীণ ও দরবারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বহু আগে কারবালার শোকাবহ ঘটনা স্মরণ করে এখানে জারি গান পরিবেশিত হতো। সেই জারির আসরকে ঘিরে কয়েকটি খাবারের দোকান বসত। ধীরে ধীরে সেই আয়োজনই রূপ নেয় বড় মেলায়। তখন থেকেই মাহফিলে আগত মানুষের জন্য বড় ডেকে শরবত বিতরণের যে রীতি চালু হয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
দীঘিকে ঘিরে লোকমুখে নানা গল্পও প্রচলিত। স্থানীয় বাসিন্দা মো. হেলাল বলেন, একসময় এলাকায় বিয়ে বা বড় সামাজিক অনুষ্ঠান হলে এই দীঘি থেকে মূল্যবান ধাতুর হাঁড়ি-পাতিলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়া যেত বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে সেগুলো আবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো। তবে এক ব্যক্তি একটি চামচ ফেরত না দেওয়ার পর থেকে সেই অলৌকিক ঘটনা বন্ধ হয়ে যায় বলে মানুষের বিশ্বাস।
মেলার আরেকটি আকর্ষণ জারি গানের আসর। বিকেলে স্থানীয় শিল্পীরা কারবালার শোকগাথা নিয়ে জারি গান পরিবেশন করেন। মেলায় আসা মো. বেলাল বলেন, গ্রামীণ সংস্কৃতির এই আয়োজন এখন খুব একটা দেখা যায় না। তাই প্রতিবছরই জারি গান শুনতে এখানে আসেন।
ছুটি থাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে মেলায় এসেছেন সরকারি চাকরিজীবি তাজ উদ্দিন সুমন । তিনি বলেন, শিশুর জন্য খেলনা কিনেছেন, পরিবারের জন্যও নিয়েছেন নানা খাবার। এক দিনের এই মেলা শুধু কেনাবেচার আয়োজন নয়। এটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, লোকবিশ্বাস, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিক মিলনমেলার এক জীবন্ত ঐতিহ্য। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে আশুরার দিনে পরীর দীঘির পাড়ে সেই ঐতিহ্যই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়