আব্বাস হোসাইন আফতাব
রাঙ্গুনিয়া নদী, খাল, বিল ও পুকুরবেষ্টিত একটি জনপদ। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য যেমন এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ, তেমনি প্রতি বছর এটি হয়ে ওঠে অনেক পরিবারের কান্নার কারণ। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা রাঙ্গুনিয়ায় নতুন নয়। প্রতিবছরই কোনো না কোনো পরিবার তাদের আদরের সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায়ই শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বাড়ির পাশের পুকুর, খাল, ডোবা কিংবা জলাবদ্ধ স্থানে খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায় শিশুরা। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের নিবিড় তদারকি এবং সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে এ ধরনের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাঙ্গুনিয়ায় এখনো শিশু-কিশোরদের জন্য কোনো আধুনিক সুইমিংপুল বা নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।
শিশুদের সাঁতার শেখার সুযোগ না থাকায় তারা জরুরি মুহূর্তে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। অথচ সাঁতার শুধু একটি খেলা নয়, এটি জীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিশ্বের অনেক দেশে স্কুল পর্যায়েই সাঁতার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হারও কমেছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এ কে এম খাইরুদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী হিরু বলেন, “রাঙ্গুনিয়া নদী, খাল ও পুকুরবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় শিশুদের জন্য সাঁতার শেখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবছর পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। একটি আধুনিক সুইমিংপুল ও সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে শিশুদের জীবন রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের সাঁতারু তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাঁতার কেবল একটি খেলা নয়, এটি জীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। তাই রাঙ্গুনিয়ায় একটি সুইমিংপুল নির্মাণ এবং স্কুলভিত্তিক সাঁতার প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হাসান বলেন, “পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। রাঙ্গুনিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতায় শিশুদের সাঁতার শেখা একটি প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা।”
তিনি আরও বলেন, “একটি আধুনিক সুইমিংপুল ও সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সময়োপযোগী দাবি। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমার পাশাপাশি ক্রীড়া ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শুধু একটি সুইমিংপুল নির্মাণই নয়, এর পাশাপাশি স্কুলভিত্তিক সাঁতার শিক্ষা, ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাঙ্গুনিয়ার মতো জলাশয়বেষ্টিত এলাকায় সাঁতার জানা বিলাসিতা নয়, বরং জীবন রক্ষার অপরিহার্য দক্ষতা। একটি আধুনিক সুইমিংপুল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়তো ভবিষ্যতে অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর এই নীরব মহামারি রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের দাবি। কারণ একটি শিশুর জীবন বাঁচানো মানে একটি পরিবারকে বাঁচানো, একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।