বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

সব দুর্যোগে সবার আগে চট্টগ্রাম, নিজের দুর্যোগে কেন এতটা নিঃসঙ্গ?

  • প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৫৭ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতি‌বেদক: বাংলা‌দেশ দুর্যোগের ইতিহাসে চট্টগ্রামের নাম উচ্চারিত হয় এক ভিন্ন কারণে। দেশের যেখানেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্য কোনো মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, সেখানেই ত্রাণ, উদ্ধার ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম নিয়ে সবার আগে ছুটে যাওয়া মানুষের তালিকায় ছিল চট্টগ্রামের অসংখ্য তরুণ, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ। মানবিকতার এই ঐতিহ্যই চট্টগ্রামকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

কিন্তু আজ সেই চট্টগ্রামই ভয়াবহ বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের মুখোমুখি। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে। হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে একটি প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—সব দুর্যোগে অন্যের পাশে দাঁড়ানো চট্টগ্রাম, নিজের দুর্যোগে কেন নিজেকে এতটা একা মনে করছে?

অনেক স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, অতীতের বিভিন্ন দুর্যোগের তুলনায় এবার জাতীয় পর্যায়ে মানবিক উদ্যোগ, ত্রাণ সংগ্রহ এবং জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ছে। একই সঙ্গে জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সংকট প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি বলেও অনেকের অভিমত। যদিও এ ধরনের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের এই অনুভূতিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দুর্যোগ কতটা জাতীয় গুরুত্ব পাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তথ্যপ্রবাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, গণমাধ্যমের কাভারেজ এবং ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্যমানতার ওপর। ফলে কোথাও কোথাও বাস্তবতার তুলনায় কম গুরুত্ব পাওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই এই সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, জাতীয় মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

তবে আশার বিষয়, চট্টগ্রামের মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তরুণরা নৌকা নিয়ে দুর্গত মানুষ উদ্ধার করছেন, স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন দুর্গম এলাকায়। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু বিপর্যয়ের ব্যাপকতার তুলনায় এসব উদ্যোগ স্পষ্টতই অপ্রতুল।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও উদ্ধার সহায়তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে পুনর্বাসনের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও।

দুর্যোগ কোনো অঞ্চল চেনে না, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ও দেখে না। আজ যে বিপদে চট্টগ্রাম, কাল হয়তো অন্য কোনো জেলা বা অঞ্চল। তাই দুর্যোগের সময় সহমর্মিতা ও সহযোগিতাও হওয়া উচিত সর্বজনীন।

সময়ের সঙ্গে বন্যার পানি নেমে যাবে, মানুষ আবার নতুন করে ঘর গড়বে, জীবনও স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এই কঠিন সময়ে কে পাশে দাঁড়িয়েছিল আর কে নীরব ছিল—সেই স্মৃতি মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যাবে না। তাই আজ প্রয়োজন সহানুভূতির নয়, কার্যকর মানবিক উদ্যোগের। কারণ দুর্যোগে আক্রান্ত চট্টগ্রাম শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্ব।

 

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews