ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি অসংক্রামক রোগ। প্রতি বছরই এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণত ডায়াবেটিসের ঝুঁকির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ এবং বংশগত কারণকে দায়ী করা হয়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী একটি তথ্য। গবেষকদের দাবি, একজন মানুষের রক্তের গ্রুপও ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘বি’ রক্তের গ্রুপের ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যান্য রক্তের গ্রুপের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত ৫১টি পৃথক গবেষণার তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করেন। এসব গবেষণায় কয়েক হাজার মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য পর্যালোচনা করা হয়। বিশ্লেষণের ফলাফলে দেখা যায়, ‘বি’ রক্তের গ্রুপের মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অন্য রক্তের গ্রুপের মানুষের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি।
প্রায় ৬ হাজার ৮৭০ জনের স্বাস্থ্যতথ্যের ভিত্তিতে এ ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বিভিন্ন রোগের সঙ্গে রক্তের গ্রুপের সম্পর্ক নিয়ে আগে থেকেই নানা গবেষণা থাকলেও ডায়াবেটিসের সঙ্গে এই সম্ভাব্য সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কোনো ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ ‘বি’ হলেই যে তিনি নিশ্চিতভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবেন, এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
গবেষণায় শুধু একটি সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটির প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। একজন ব্যক্তির ডায়াবেটিস হবে কি না, তা নির্ভর করে তার জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসের সবচেয়ে বড় কারণ এখনো অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা। অতিরিক্ত ওজন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে রোগটির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
অর্থাৎ, ‘বি’ রক্তের গ্রুপ না হলেও যেকোনো ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার ‘বি’ গ্রুপের হয়েও কেউ যদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন, তাহলে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব।
গবেষকরা এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করছেন, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তাদের ধারণা, বিভিন্ন রক্তের গ্রুপ শরীরের কিছু জৈবিক প্রক্রিয়াকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা, প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বা গ্লুকোজ বিপাক প্রক্রিয়ায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের গ্রুপ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এজন্য নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার এবং মানসিক চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়া যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে বা যাদের বয়স বাড়ছে, তাদের নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। এতে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং জটিলতা এড়ানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই গবেষণা রক্তের গ্রুপ ও ডায়াবেটিসের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দিলেও সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় এখনো একই—সচেতন জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।