প্রতিবেদন: সৌরভ সাহা, বর্ষা নামলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বন-পাহাড়ে প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপের দেখা মেলে। চারদিকে সবুজের সমারোহের মধ্যে বাঁশঝাড়ের গোড়া থেকে মাথা তুলে বেরিয়ে আসে কচি বাঁশের অঙ্কুর, যা স্থানীয়ভাবে ‘বাঁশ কোড়ল’ নামে পরিচিত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে এটি শুধু একটি সবজি নয়, বরং তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ি নারী-পুরুষ ঝুড়ি ও দা নিয়ে বন-পাহাড়ে ছুটে যান। কচি অবস্থায় কোড়ল সংগ্রহ করা হয়, কারণ বড় হয়ে গেলে এটি শক্ত হয়ে যায় এবং খাবার হিসেবে তেমন উপযোগী থাকে না।
সংগৃহীত বাঁশ কোড়ল স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি হয়। অনেক ব্যবসায়ী সেগুলো কিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। কয়েক বছর আগেও পাহাড়ের বাইরের মানুষের কাছে বাঁশ কোড়ল তেমন পরিচিত ছিল না। কিন্তু এখন পাহাড়ি খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সবজির চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পাহাড়ি পরিবারের রান্নাঘরে বাঁশ কোড়লের ব্যবহার বৈচিত্র্যময়। শুঁটকি মাছের সঙ্গে বাঁশ কোড়লের ঝোল, দেশি মুরগির মাংস, গরুর মাংস কিংবা বিভিন্ন পাহাড়ি মসলায় রান্না করা কোড়ল স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। অনেকেই এটি ভর্তা, ভাজি, স্যুপ বা সবজি হিসেবেও রান্না করেন। বিশেষ উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নেও বাঁশ কোড়লের তৈরি খাবার পরিবেশন করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁশ কোড়লে রয়েছে প্রচুর খাদ্যআঁশ, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এতে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ কম হওয়ায় এটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে রান্নার আগে অবশ্যই ভালোভাবে সেদ্ধ করে প্রাকৃতিক তিক্ততা দূর করতে হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষা মৌসুমে বাঁশ কোড়লের বিক্রি বাড়ায় অনেক পাহাড়ি পরিবারের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কৃষিকাজের সুযোগ সীমিত, সেখানে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ ও বিক্রি অনেক পরিবারের জন্য মৌসুমি জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পর্যটনের প্রসারের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বাঁশ কোড়লের তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন। অনেকেই বাড়ি ফেরার সময় কাঁচা বা সংরক্ষিত বাঁশ কোড়ল সঙ্গে নিয়ে যান। এতে পাহাড়ি এই সবজির বাজার আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
কৃষি ও বন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাঁশ কোড়ল সংগ্রহের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে বাঁশের বাগান সম্প্রসারণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং আধুনিক বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যে পরিণত হতে পারে। দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবনধারা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বাঁশ কোড়ল আজ আর কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমাবদ্ধ একটি সবজি নয়। এর স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দিন দিন নতুন পরিচয় তৈরি করছে। পাহাড়ের এই সবুজ উপহার এখন ধীরে ধীরে দেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় স্থায়ী স্থান করে নিচ্ছে।