স্বজনদের আহাজারি থামানোর ভাষা জানা নেই কারও। চার ভাইকে শেষবারের মতো দেখতে আসা মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল প্রতিবেশীদের। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে এভাবে চার ভাইয়ের একসঙ্গে লাশ হয়ে ফেরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ।
এই জানাজায় অংশ নিতে হাটহাজারী থেকে ছুটে এসেছেন সৌদি আরব প্রবাসী আবু সুফিয়ান। নিহতদের কেউ হন না তিনি, আগে কখনো দেখেনওনি। আবু সুফিয়ান ভেজা চোখে বলছিলেন,
“ফেসবুক আর মিডিয়ায় যখন এই চার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা পড়লাম, কলিজাটা কেঁপে উঠেছিল। আমিও প্রবাসী। একজন প্রবাসী হিসেবে এই জানাজায় শরিক না হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না। মনকে শান্ত করতে ছুটে এসেছি।”
শেষ হলো না বাড়ি ফেরার অপেক্ষা–
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওমানে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছিলেন চার ভাই। উদ্দেশ্য ছিল একটাই পরিবারকে একটু ভালো রাখা। সম্প্রতি তাঁদের দেশে ফেরার সব প্রস্তুতিও শেষ হয়েছিল। সব ঠিকঠাক থাকলে আর কিছুদিন পরেই তাঁরা মায়ের কোলে ফিরে আসতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দেশে ফেরার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ওমানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় চার ভাইয়ের প্রাণ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের মৃত ঘোষণার পর থেকেই পরিবারটিতে আনন্দের বদলে নেমে আসে অন্ধকার।
মঙ্গলবার রাতে ঢাকার বিমানবন্দরে চার ভাইয়ের মরদেহ এসে পৌঁছায়। সেখানে উপস্থিত থেকে লাশগুলো গ্রহণ করেন হুমাম কাদের চৌধুরী এমপি। সকালে যখন মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়, তখন পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
ছোট ভাইয়ের ইমামতিতে শেষ বিদায়-
বেলা ১১টা। হোছনাবাদ লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। রাঙ্গুনিয়া তো বটেই, আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও মানুষ ছুটে এসেছেন চার রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানাতে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তটি আসে যখন জানাজার ইমামতির জন্য সামনে এসে দাঁড়ান নিহত চার ভাইয়ের একমাত্র জীবিত ছোট ভাই মো. এনাম। যে ভাইদের হাত ধরে বড় হওয়া, তাঁদেরই শেষ বিদায়ের নামাজ পড়াতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জানাজা শেষে এনামের অশ্রুসিক্ত, আকুল মোনাজাতে উপস্থিত হাজারো মুসল্লির চোখ ফেটে জল নামে। পুরো মাঠজুড়ে তৈরি হয় এক স্তব্ধ, বেদনাবিধুর পরিবেশ।
জানাজা শেষে স্থানীয় মসজিদের পাশে কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। প্রবাসের মাটিতে যে চার ভাই ছায়ার মতো একে অপরের পাশে ছিলেন, চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সময়ও কেউ কাউকে ছেড়ে গেলেন না। পাশাপাশি চার কবরে দাফন করা হলো তাঁদের।