আব্বাস হোসাইন আফতাব:
গায়ে স্কুলের পোশাক, কাঁধে ব্যাগ। ছোট্ট মেয়েটি বাড়ির আঙিনা জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। তার বিশ্বাস, বাবা একটু পরেই ফিরে আসবেন। তাকে আগের মতো কোলে তুলে নেবেন। কিন্তু সে জানে না, তার প্রিয় বাবা আর কখনো ফিরবেন না।
এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যই ছিল রাউজানে গুলিতে নিহত রাঙ্গুনিয়ার যুবদল নেতা মো. মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ এর গ্রামের বাড়ির সবচেয়ে বেদনাময় মুহূর্ত।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন মাসুদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় করে আসা ৫ থেকে ৬ জন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
রোববার(১৪ জুন) দুপুরে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেখানে নামে মানুষের ঢল। বাড়ির আঙিনা, সড়ক ও আশপাশের এলাকা ভরে যায় স্বজন, নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ আর একটাই দাবি হত্যার বিচার।
স্বজনদের কান্নার মাঝেও সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ছিল ছোট্ট মেয়েটির নিষ্পাপ অপেক্ষা। বাবার মৃত্যুর খবর না জেনে সে বারবার চারদিকে তাকাচ্ছিল। হয়তো ভাবছিল, বাবা ফিরে এসে আগের মতো তাকে কোলে তুলে নেবেন। উপস্থিত অনেকেই সেই দৃশ্য দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।
মাসুদের জানাজায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তিনি সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও তার নাম আলোচনায় ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কাপ্তাই আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ মানুষ। কয়েক ঘণ্টা পর প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
এদিকে হত্যার কারণ নিয়ে এলাকাজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিকে সামনে আনছেন। তবে এসবই স্থানীয়দের ধারণা, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
মাসুদের ভাই ও বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন অভিযোগ করেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়, এর সঙ্গে ভেঙে যায় একটি পরিবারের স্বপ্নও। ছোট্ট সেই মেয়েটি হয়তো বড় হয়ে বুঝবে, যেদিন সে স্কুলের পোশাক পরে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল, সেদিনই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার শুরু হয়েছিল।বাড়িতে মানুষের ঢল, স্বজনদের আহাজারি আর একটি শিশুর নীরব অপেক্ষা, সব মিলিয়ে মাসুদ হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, এটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার এক মানবিক অধ্যায় হয়ে উঠেছে।