ঈদের আনন্দের দিনে যখন সবাই কুরবানির কাজ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন বেসরকারি চাকরিজীবি মো. হোসেন । কিন্তু রাঙ্গুনিয়া থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে তাঁর পরিবারকে পড়তে হয় চরম ভোগান্তি ও হয়রানির মুখে। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে সিটি স্ক্যান রুম, লিফট, কিংবা ওয়ার্ড, প্রতিটি পদে পদে বকশিস ও অতিরিক্ত টাকা ছাড়া মেলেনি কোনো সহযোগিতা।
চমেক এর জরুরী বিভাগ,বহি:র্বিভাগ থেকে হাসপাতালের আন্ত:বিভাগ পর্যন্ত পরিচয় গোপন রেখে রোগীর সাথে ছিলেন এই প্রতিবেদক।
অ্যাম্বুলেন্স সংকট ও প্রাথমিক ধাক্কা -
ভুক্তভোগী রোগীর স্ত্রী ছায়রা বেগম জানান, ঈদের দিন দুপুরে তাঁর স্বামী হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ঈদের দিন হওয়ায় কোনো পরিবহন না পেয়ে প্রতিবেশীর সিএনজি অটোরিকশা যোগে তাঁকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রোগীকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে রেফার করা হলেও হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটিও তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি। একটি রোগী নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ছিল এবং অন্যটির চালক বাড়িতে কুরবানির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরে অবশ্য ফোন পেয়ে চালক দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসেন এবং রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
জরুরি বিভাগে রোগীর ভিড় ও হুইলচেয়ার ‘বাণিজ্য’
ঈদের দিন হওয়ায় কুরবানির পশুর কাজ করতে গিয়ে হাতসহ বিভিন্ন অঙ্গ কেটে যাওয়া রোগীর সংখ্যাই ছিল জরুরি বিভাগে বেশি। চমেক হাসপাতালে পৌঁছানোর পর একজন নারী আয়া হুইলচেয়ার নিয়ে এগিয়ে আসেন। ওইদিন বেশির ভাগ অমুসলিম চিকিৎসক ও কর্মচারী ডিউটিতে ছিলেন। আয়া রোগীকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং চিকিৎসক রোগীকে সিটি স্ক্যান করানোর পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে সিটি স্ক্যান করানোর পর সরকারি ফি বাবদ ২ হাজার টাকা কাউন্টারে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, সিটি স্ক্যান কক্ষের কর্মচারীরা ‘বকশিস’ ছাড়া রোগীকে ছাড়ছিলেন না। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য সেখানে কালক্ষেপণ করা হয়।
লিফট থেকে ওয়ার্ড: সর্বত্রই টাকার খেলা
ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়। রোগীকে ৩ তলার ওয়ার্ডে নেওয়ার জন্য লিফটে উঠলে লিফটম্যানকে ২০ টাকা দেওয়ার জন্য জোর করেন ওই আয়া। লিফট থেকে নেমে ওয়ার্ডে পৌঁছালে চিকিৎসক রোগীকে ভর্তি দিলেও শুরু হয় নতুন ধাপে টাকা দাবি।
ভালো বেডের জন্য: ওয়ার্ড বয় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভালো বেড পেতে হলে ১০০ টাকা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে স্বজনরা তাই করেন।
আয়ার দাবি ৫০০ টাকা: জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত রোগীকে এগিয়ে দেওয়া বাবদ ওই নারী আয়া সরাসরি ৫০০ টাকা দাবি করে বসেন। রোগীর স্বজনরা জানান, রোগী একটি পোশাক কারখানায় সামান্য বেতনে চাকরি করেন এবং এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে ২০০ টাকা দিতে চাইলে আয়া তা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ৫০০ টাকাই আদায় করেন।
বালিশের জন্য বাড়তি খরচ: সব টাকা চুকিয়ে রোগীকে যখন বেডে দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় বেডে কোনো বালিশ নেই। কর্তব্যরতদের কাছে জানতে চাইলে বলা হয়, হাসপাতালে বালিশের কোনো ব্যবস্থা নেই, বালিশ বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে!
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষোভ
ভুক্তভোগী স্বজন জানান, সংকটাপন্ন রোগীর জীবনের ঝুঁকি থাকায় এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার স্বার্থে তিনি কোনো ধরনের বাগ্বিতণ্ডায় জড়াননি। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন:
"আমার মতো একজন মানুষ যদি সরকারি হাসপাতালে এসে এত হয়রানির শিকার হই, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের কী অবস্থা হচ্ছে? টাকা ছাড়া এখানে কেউ কোনো সহযোগিতাই করতে চায় না।"
ঈদের ছুটির দিনে সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এভাবে পদে পদে অর্থ আদায়ের ঘটনায় চমেক হাসপাতাল প্রশাসনের নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।