আব্বাস হোসাইন আফতাব : কর্ণফুলী নদী তখন উত্তাল। হঠাৎ শুরু হওয়া ঝড়ো হাওয়ায় মুহূর্তেই বদলে যায় নদীর চিত্র। প্রবল বাতাস আর ঢেউয়ের তাণ্ডবে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলি ইউনিয়নের দেওয়ানজীঘাট ও কোদালা ঘাট এলাকায় বুধবার (২৮ মে) দুপুরে একটি নৌকা ডুবে যায়। নৌকায় থাকা একই পরিবারের সদস্যরা তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। চারদিকে শুধু চিৎকার আর আতঙ্ক।
ঠিক সেই সময় নিজের জীবনের কথা না ভেবে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ১৫ বছরের এক কিশোর মো. রবি উল্ল্যাহ। সঙ্গে ছিলেন তার বড় ভাই অলি উল্ল্যাহ, বন্ধু শিমুল ও আব্দুল্লাহ। পিতা মোহাম্মদ বাবুলের ইঞ্জিনচালিত বোট নিয়ে তারা ছুটে যান ডুবন্ত মানুষদের দিকে।
প্রবল ঝড়ের মধ্যে নদীতে নামা যে কতটা ভয়ংকর, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। কিন্তু ভয়কে জয় করেই তারা উদ্ধার অভিযানে নামেন। প্রায় ১০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর চেষ্টায় ডুবে যাওয়া দুই শিশুসহ পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করেন তারা।
উদ্ধার অভিযানে গিয়ে নিজেও আহত হন রবি। তার পা কেটে যায়। তবুও থামেননি তিনি। মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে চালিয়ে গেছেন উদ্ধার কাজ।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন একটাই নাম রবি উল্ল্যাহ। এলাকাবাসী বলছেন, এত অল্প বয়সে এমন সাহসিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। কেউ কেউ তাকে “কর্ণফুলীর সাহসী কিশোর” বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
তবে এত প্রশংসার মাঝেও রবির কণ্ঠে রয়ে গেছে আক্ষেপ। নিখোঁজ নববধূ কনিকা দাশকে উদ্ধার করতে না পারার কষ্ট এখনও তাড়া করে ফিরছে তাকে। রবি উল্ল্যাহ বলেন, “নববধূকেও যদি বাঁচাতে পারতাম, তাহলে আরও ভালো লাগতো।”
রবির বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার কোদালা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদার পাড়ায়। নদীর সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তার পিতা মোহাম্মদ বাবুল দেওয়ানজীঘাট এলাকার ইঞ্জিন নৌকা চালক। ছোটবেলা থেকেই নদী আর নৌকার সঙ্গে বেড়ে ওঠা রবির সাহসিকতা যেন সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন।
এদিকে নিখোঁজ কনিকা দাশের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল পর্যন্ত অভিযান চালিয়েছে। ঝড়ের সেই ভয়াল দিনে যখন অনেকে আতঙ্কে দিশেহারা, তখন কয়েকজন তরুণের মানবিক সাহস পাঁচটি প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে জীবনে। কর্ণফুলীর ঢেউ হয়তো একদিন শান্ত হবে, কিন্তু রবি উল্ল্যাহদের সাহসিকতার গল্প রয়ে যাবে মানুষের মুখে মুখে।